প্রকাশকালঃ ৩০ আগস্ট ২০২৬ রাত ০৪ টা ০০ মিনিট

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় পুলিশের ধাওয়ায় পুকুরে কালো রঙের টয়োটা হাইয়েস মাইক্রোবাস ফেলে সাঁতরে আসামীদের পালিয়ে যাওয়ার নাটকীয় সেই ২৫২ কেজি কথিত ভারতীয় গাঁজা জব্দের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশ ডেটাবেজের তথ্য অনুযায়ী গাড়িটির নিবন্ধিত মালিকের সন্ধান পাওয়া গেলেও, তার দাবি এবং পরবর্তী আচরণ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত গাড়িটির নিবন্ধিত প্রকৃত মালিক মোহাম্মদ ইসমাইল প্রাথমিকভাবে দাবি করেছেন তিনি বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন এবং স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কিস্তিতে গাড়িটি বিক্রি করেছেন কিস্তির টাকা পরিশোধ করে দিলে তিনি গাড়ির মালিকানা ট্রান্সফার করে দিবেন। তবে কথিত কিস্তিতে বিক্রির ক্রেতার পরিচয়, স্ট্যাম্প চুক্তিপত্র বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ চাইতেই তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নম্বর ব্লক করে দিয়েছেন।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পুলিশি অভিযান

গত ২৮ আগস্ট ২০২৬ (শুক্রবার) ভোররাতে কসবা থানা পুলিশের একটি দল সীমান্ত এলাকা দিয়ে মাদকের বড় চালান প্রবেশের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সৈয়দাবাদ-নয়নপুর সড়কে চেকপোস্ট স্থাপন করে। এসআই শামীমের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনাকালে সন্দেহভাজন একটি কালো রঙের টয়োটা হাইয়েস মাইক্রোবাসকে থামার সংকেত দেওয়া হয়।

চালক পুলিশের সংকেত অমান্য করে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে কসবা-সৈয়দাবাদ সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত আন্দিরপাড়-মনকাশাইর সড়কে ঢুকে পড়ে। ধাওয়ার একপর্যায়ে বিনাউটি ইউনিয়নের খিদিরপুর এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাইক্রোবাসটি সড়কের পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায়। এ সময় চালক ও মাদক পাচারকারীরা পানিতে সাঁতরে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে পুলিশ ক্রেনের সহায়তায় পুকুর থেকে নিমজ্জিত গাড়িটি উদ্ধার করে এবং ৯টি প্লাস্টিকের বস্তায় মোড়ানো ২৫২ কেজি ভারতীয় গাঁজা জব্দ করে। ঘটনাটি জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে—বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ডেইলি অবজারভার এবং কালের বিবর্তন-এ প্রকাশিত হয়।

বিআরটিএ রেকর্ড ও মালিকের পরিচয়

পুলিশের ডিজিটাল ভেহিক্যাল ভেরিফিকেশন ও বিআরটিএ রেকর্ড পর্যালোচনা করে জব্দকৃত মাইক্রোবাসটির নিম্নলিখিত অফিসিয়াল তথ্য পাওয়া যায়:

নিবন্ধিত মালিকের বক্তব্য ও সন্দেহজনক নীরবতা

বিআরটিএ রেকর্ডে থাকা মোবাইল নম্বরের WHATSAPP (০১৭৮৬১১৬১১৯) যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ ইসমাইল লিখিতভাবে জানান:

“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, ভালো আছেন? গাড়িটা আমার নামে ছিল। আমি কিস্তিতে গাড়িটা বিক্রি করে ফেলেছি। কিস্তি পরিশোধ হওয়ার পর উনার নামে নাম ট্রান্সফার করে দেব। আমি থাকি প্রবাসে ভাইয়া, আমি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করে ফেলেছি।”

পরবর্তীতে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তার দাবির সমর্থনে— ১. গাড়িটি কার কাছে বিক্রি করা হয়েছিল (ক্রেতার নাম, এনআইডি ও ঠিকানা)? ২. নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত চুক্তিপত্রের কপি এবং ৩. কিস্তি লেনদেনের ব্যাংকিং বা আর্থিক নথিপত্র দেখতে চাওয়া হয়।

তবে এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর কোনো সদুত্তর না দিয়ে মোহাম্মদ ইসমাইল তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং সংযোগটি ব্লক করে দেন।

আইনি ও অপরাধ তদন্তের পর্যবেক্ষণ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরযান আইন অনুযায়ী বিআরটিএ-তে আনুষ্ঠানিকভাবে মালিকানা বদল (Transfer of Ownership) না হওয়া পর্যন্ত নিবন্ধিত মালিকই গাড়ির যেকোনো বেআইনি ব্যবহারের প্রাথমিক দায় এড়াতে পারেন না। বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে জব্দকৃত যানের ক্ষেত্রে মালিকের দায় অত্যন্ত সংবেদনশীল।

অনুসন্ধানকারীদের মতে, সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালানে ব্যবহৃত যানবাহনের ক্ষেত্রে স্ট্যাম্পে বিক্রির অজুহাত দিয়ে প্রকৃত অপরাধী আড়াল করার প্রবণতা একটি পরিচিত কৌশল। কিস্তিতে বিক্রির দাবি করা হলেও চুক্তিপত্র ও ক্রেতার পরিচয় গোপন রাখা এবং যোগাযোগের মাধ্যম ব্লক করে দেওয়া এই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।

পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য

কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদ জানিয়েছেন, জব্দকৃত ২৫২ কেজি গাঁজা ও মাইক্রোবাসটির ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া চালক, পাচারকারী এবং গাড়ির মালিকানা ও ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জোর তদন্ত চলছে।

**তবে এই বিষয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটোনে ব্ল্যাক লেন্সের তদন্ত চলমান রয়েছে………