ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার কোষাধ্যক্ষ মো. ফজলুল করিমের (যিনি খসরু নামেও পরিচিত) বিরুদ্ধে দাপ্তরিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি তহবিল তছরুপের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর দাখিলকৃত একটি লিখিত অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিনা অনুমতিতে বিদেশ গমন, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল, ব্যবসায়ীদের হয়রানি এবং বিধিবহির্ভূতভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মো. ফজলুল করিম ২০০৬ সালে কসবা পৌরসভায় কোষাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থাকার সুবাদে তিনি লাইসেন্স পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করে আসছেন। এই দীর্ঘ মেয়াদে তিনি সেবাসমূহ প্রদানে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের হয়রানি করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
উত্থাপিত অভিযোগসমূহের বিবরণ
লিখিত অভিযোগ ও প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রধানত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে:
- অননুমোদিত বিদেশ গমন ও জালিয়াতি: অভিযোগ রয়েছে যে, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কোনো পূর্বানুমতি বা দাপ্তরিক অনুমোদন ছাড়াই তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় গমন করেন। পরবর্তীতে ২০১০ সালের মার্চ মাসে দেশে ফিরে এসে একটি ভুয়া মেডিকেল সনদ ও অন্যান্য জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে পুনরায় চাকরিতে যোগদান করেন। শুধু তাই নয়, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এক বছর মেয়াদী সময়ের সম্পূর্ণ বকেয়া বেতন-ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে, যা সরকারি তহবিল আত্মসাতের শামিল বলে দাবি করা হয়েছে।
- সেবাগ্রহীতা ও ব্যবসায়ীদের হয়রানি: পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শকদের ভয়ভীতি প্রদর্শনপূর্বক অন্যত্র বদলি করানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন বা প্রদানের নামে ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। আদায়কৃত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পৌরসভার সরকারি রাজস্ব তহবিলে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। চাহিদামাফিক অতিরিক্ত অর্থ প্রদান না করলে সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘসূত্রিতা ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হতো।
- বেনামে ব্যবসা পরিচালনা: অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা কসবা নতুন বাজারে ‘মেসার্স ফাহিম এন্টারপ্রাইজ’ নামক গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং কসবা পুরাতন বাজারে ‘টেস্টি বাইট’ নামক একটি রেস্টুরেন্ট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
- বিধিবহির্ভূত বেতন-ভাতা গ্রহণ: তার বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও আইন অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা না হয়ে নিয়মিতভাবে পূর্ণ বেতন-ভাতা গ্রহণ করে আসছেন।
সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া
উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. ফজলুল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি দক্ষিণ কোরিয়ায় যাইনি। আমি তিন মাস অসুস্থতাজনিত ছুটিতে ছিলাম। যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমার নয়, আমার ভগ্নিপতির মালিকানাধীন।”
প্রশাসনিক পদক্ষেপ
এ বিষয়ে কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক ছামিউল ইসলামের সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, “বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সংবাদটি প্রকাশের দিন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দাখিলকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে স্থানীয় সুধীসমাজ ও ব্যবসায়ীরা পুরো ঘটনার একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা প্রশাসনিক তদন্ত দাবি করেছেন।