দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেওয়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে একটি নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের পথে হাঁটছে সরকার। নতুন এই বাহিনীর নাম হতে যাচ্ছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি)

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই বাহিনীর নামকরণে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যদিও ঠিক কত তারিখ পর্যন্ত মতামত পাঠানো যাবে, তা খসড়ায় সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অংশীজনদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতগুলো যাচাই-বাছাই ও প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন শেষে খসড়াটি চূড়ান্ত করে খুব দ্রুতই মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর তা জাতীয় সংসদে আইন হিসেবে পাস হওয়ার কথা রয়েছে।

পুরনো কাঠামোর পরিবর্তন ও জবাবদিহির নতুন বিধান

২০০৩ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল র‌্যাব। নতুন এসআরবি গঠনে বাহিনীর মূল দায়িত্বে বড় কোনো পরিবর্তন আনা না হলেও, এর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কঠোর বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।

অতীতে র‌্যাবের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠলেও, নতুন বাহিনীতে সাধারণ নাগরিক যাতে সরাসরি কোনো অন্যায় আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার বা হয়রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হয়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি বিশেষ ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

পুলিশের অধীনে পরিচালিত হতে যাওয়া এই বিশেষায়িত ইউনিটে কেবল পুলিশই নয়, অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও প্রেষণে সদস্য আনা যাবে। কমপক্ষে দুই বছরের জন্য প্রেষণে নিয়োজিত বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত হতে পারবেন তারা। এ ছাড়া ঢাকার মূল সদর দপ্তর ছাড়াও দেশের যেকোনো স্থানে প্রয়োজন অনুযায়ী এই বাহিনীর ইউনিট স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ক্ষমতা ও কার্যপরিধি

খসড়া আইন অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধি মেনে এসআরবির সদস্যরা নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা পাবেন। তাদের প্রধান লক্ষ্যমাত্রাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

এছাড়া আদালত, সরকার বা পুলিশের আইজিপির নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তারা পুলিশ প্রবিধান মেনে এই তদন্ত পরিচালনা করবেন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

যেভাবে কাজ করবে ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’

নতুন এই বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে অভিযোগ প্রতিকার কমিটিটিকে। এই কমিটির গঠনপ্রকৃতি ও এখতিয়ার বেশ বিস্তৃত:

এই কমিটি নাগরিকদের যেকোনো অভিযোগ খতিয়ে দেখতে পারবে এবং প্রয়োজনে আলাদা অনুসন্ধান দল গঠন করতে পারবে। প্রাথমিক সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে তারা। এমনকি ইউনিটের কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অযাচিত বা অবৈধ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করার ক্ষমতাও থাকবে এই কমিটির হাতে।

কঠোর শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি

সদস্যদের শৃঙ্খলা রক্ষায় খসড়ায় বেশ কড়া বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে মাদক সেবন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য, দায়িত্বে অবহেলা, বেআইনি অর্থ আদায়, অস্ত্র বা সরঞ্জামের অপব্যবহার কিংবা জুয়ার মতো অপরাধে জড়ালে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা মিললে অভিযুক্ত সদস্যকে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানোসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কোনো সদস্য শৃঙ্খলা ভেঙে বা অপরাধ করে পালিয়ে গেলে, ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক তাকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় থানার সহায়তায় উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় ব্যাটালিয়নে সোপর্দ করার ব্যবস্থা করবেন।

যা হবে র‌্যাবের বর্তমান জনবল ও সম্পদের

নতুন এই আইন পাস ও কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিলুপ্ত র‌্যাবের যাবতীয় সম্পদ, তহবিল, জনবল, চলমান মামলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হয়ে যাবে। পাশাপাশি, নতুন বিধিমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাবের পুরনো কার্যবিধিগুলোই প্রয়োজনীয় অভিযোজন সাপেক্ষে চালু থাকবে।