মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, সম্পাদক ও প্রকাশক ব্ল্যাক লেন্স ২.০ | 25-08-2026
রাজপথ এখন যেন এক রক্তক্ষয়ী ক্যানভাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সাধারণ মানুষের মনে যে নতুন ভোরের আশা জাগিয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান। ক্ষমতা হাতবদলের পর, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিলেও সাধারণ মানুষের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরা— ‘আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’ প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে দেশে । ব্ল্যাক লেন্সের আজকের গভীর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অন্ধকার আন্ডারওয়ার্ল্ড, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং ভেঙে পড়া এক পুলিশি ব্যবস্থার গল্প।
পরিসংখ্যানের আড়ালে লাশের পাহাড়
কাগজে-কলমে পরিসংখ্যানগুলো কেবল কিছু সংখ্যা মনে হলেও, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে এক একটি পরিবারের হাহাকার।
- পুলিশের খাতায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই—এই সাত মাসেই খুনের মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি । এর মধ্যে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় মে থেকে জুলাই মাসে, যখন খুনের মামলা হয় ৯৩৪টি ।
- বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি কেড়ে নিয়েছে ১৩৪টি তাজা প্রাণ ।
- রাজনৈতিক কোন্দলের চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রথম সাত মাসে প্রায় ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৭ জন ।
- এর পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ছয় মাসে এই ধরনের অপরাধে ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে, যা আগের ছয় মাসের চেয়ে ১ হাজার ৭৫টি বেশি ।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রত্যাবর্তন: পুরোনো শকুনের নতুন শিকার
বাংলাদেশের অপরাধ জগতের জন্য ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়টা যেন এক ‘সুবর্ণ সুযোগ’ হয়ে এসেছে । রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বা বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে ‘কিলার আব্বাস’, ‘সুইডেন আসলাম’, ‘পিচ্চি হেলাল’, ‘ইমন’ ও ‘টোকাই সাগর’-এর মতো নব্বই দশকের সেই দুর্ধর্ষ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এরা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে নিজেদের হারানো সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারে এবং পুরোনো শত্রুতার হিসাব মেটাতে । যেমন, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও পিচ্চি হেলালের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা ঘটছে, যা সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে ।
লুণ্ঠিত অস্ত্র ও রাজনীতির মরণখেলা
আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি । এর সাথে যোগ হয়েছে অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান ,। এই অস্ত্রগুলো এখন কাদের হাতে? অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীরাই এখন এই অস্ত্রগুলোর নিয়ন্ত্রক । ক্ষমতার আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে দলের বাইরের প্রতিপক্ষ তো বটেই, এমনকি খোদ ক্ষমতাসীন দল বা তাদের মিত্রদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও ঝরছে রক্ত। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন ।
মেরুদণ্ডহীন পুলিশ ও সংস্কারের আক্ষেপ
এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যাদের ঢাল হয়ে দাঁড়ানোর কথা, সেই পুলিশ বাহিনী নিজেরাই এখন খাদের কিনারে। ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের একটি বড় অংশের মনোবল ভেঙে গেছে, অনেকেই কাজ করছেন চরম ভীতি আর আতঙ্ক নিয়ে ।
পুলিশের জবাবদিহিতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, রাজনৈতিক মতবিরোধের জেরে তা ভেস্তে গেছে । পুলিশ অবশ্য দাবি করছে যে বর্তমানে তাদের ওপর সরকারের কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই এবং তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করছেন । পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, দেশে চুরি-ডাকাতির মতো অপরাধ হয়তো কিছুটা কমেছে, কিন্তু হঠাৎ গজিয়ে ওঠা স্থানীয় বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে খুন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না ।
শেষ কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করে এই সংকটের সমাধান হবে না। দেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্কতার রেখা টেনেছেন যে, —”অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো, পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার, এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করলে এই দেশ খুব দ্রুত অপরাধীদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হবে ।যতক্ষণ না পর্যন্ত এই কাঠামোগত পচন দূর করা যাচ্ছে, ততক্ষণ ঢাকার রাজপথ হোক বা মফস্বলের কোনো মেঠোপথ—সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেবলই একটি মরীচিকা হয়েই থাকবে।”