ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় চেতনানাশক প্রয়োগ করে সিএনজি অটোরিকশা চালক হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। অভিযোগ অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ একটি ছিনতাই চক্র ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামক একটি মারাত্মক চেতনানাশক ব্যবহার করে চালককে অচেতন করার পর হত্যা করে এবং তার অটোরিকশাটি ছিনতাই করে।
শনিবার (২২ আগস্ট, ২০২৬) দিবাগত রাতে কুমিল্লার পৃথক দুটি স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত সন্দেহভাজনদের বিবরণ
- মো. আবুল বাশার (৪৪): পিতা- মো. শহিদুল ইসলাম, গ্রাম- দুয়ারিয়া, উপজেলা- দেবিদ্বার, কুমিল্লা।
- নাজমুন নাহার লাভলী (২৮): পিতা- মৃত রফিক মিয়া, সংরাইশ এলাকা, কোতোয়ালি থানা, কুমিল্লা।
ঘটনার পূর্বাপর ও মামলার প্রেক্ষাপট
নিহত হোসেন মিয়া ছিলেন কসবা থানার চান্দলা এলাকার বাসিন্দা এবং পেশায় একজন সিএনজি অটোরিকশা চালক। জানা যায়, গত ২৫ মে ২০২৬ সকালে তিনি উপার্জনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। রাতে তিনি ফিরে না আসায় এবং তার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের পক্ষ থেকে কসবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
নিখোঁজের তিন দিন পর, ২৮ মে বিকেলে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কসবা থানাধীন টি. আলী মোড় সংলগ্ন একটি পুকুর থেকে পুলিশ একটি ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মরদেহটি হোসেন মিয়ার বলে শনাক্ত করেন।
পরবর্তীতে, নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে কসবা থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা (মামলা নম্বর-০৩, তারিখ: ২ জুন ২০২৬) দায়ের করেন। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয় যে, পূর্বপরিকল্পিতভাবে সিএনজি অটোরিকশা, নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও যৌথ অভিযান
মামলা রুজু হওয়ার পর থেকেই ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনতে র্যাব-৯ ছায়া তদন্ত শুরু করে। গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর একটি যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়।
- প্রথম অভিযান: শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে র্যাব-৯ (সিপিসি-১) এবং র্যাব-১১ (সিপিসি-২)-এর যৌথ দল কুমিল্লার দেবিদ্বার থানাধীন বাগুরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে।
- দ্বিতীয় অভিযান: একই রাতে আনুমানিক ১টা ৫০ মিনিটে কুমিল্লা কোতোয়ালি থানাধীন নিশ্চিন্তপুর এলাকা থেকে নাজমুন নাহার লাভলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ছিনতাইয়ের অভিনব কৌশল ও কাঠামোগত নিরাপত্তা ঝুঁকি
র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, চক্রটি সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে অটোরিকশায় উঠে এবং সুযোগ বুঝে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ (সাধারণত স্কোপোলামিন জাতীয় ড্রাগ হিসেবে পরিচিত) নামক চেতনানাশক প্রয়োগ করে। চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হত্যা করে গাড়িটি ছিনতাই করা হয়।
এই ঘটনাটি প্রান্তিক পরিবহন শ্রমিকদের পেশাগত নিরাপত্তার একটি মারাত্মক কাঠামোগত দুর্বলতা উন্মোচন করে। অপরাধী চক্রগুলো রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে যে অভিনব কায়দায় অপরাধ সংঘটন করছে, তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
আইনি প্রক্রিয়া ও চলমান তদন্ত
র্যাব জানিয়েছে, এই মামলার তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এর আগে গত ৪ আগস্ট অপর এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সর্বশেষ এই দুইজনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মামলার তদন্তে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ৩৯৪ (ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় আঘাত/হত্যা) এবং ৩৪ (যৌথ দায়বদ্ধতা) ধারায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে সংশ্লিষ্ট কসবা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে র্যাবের গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।