কাঠমিস্ত্রি থেকে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক: কসবায় ভুল চিকিৎসায় মা-নবজাতকের মৃত্যুর গুঞ্জনে জমজম হাসপাতালের ভুয়া-ভূতুড়ে অনিয়ম উন্মোচন
সম্প্রতি একাধিক অনির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক তথ্যে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার জমজম হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসায় এক নবজাতক ও তাঁর মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও অনিয়মের প্রশ্ন উঠেছে। যদিও উক্ত মৃত্যুর ঘটনার বিষয়ে এখনো কোনো দাপ্তরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি, তবে ব্ল্যাক লেন্সের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উক্ত প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর, ভুয়া ও ভূতুড়ে কর্মকান্ডের তথ্য উঠে এসেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রশাসনিক পদ বা CEO (নির্বাহী পরিচালক) পদে যিনি আসীন রয়েছেন, তিনি পেশায় পূর্বে একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন।
প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক নথির যোগসূত্র
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংগৃহীত কসবা সরকার ফার্নিচার নামক কাঠশিল্প ও আসবাবপত্র দোকানের ভিজিটিং কার্ডে প্রোপাইটর হিসেবে ‘এম.ডি রবিউল সরকার’ নাম ও ছবি দেখা যায়। উক্ত কার্ডে যোগাযোগের প্রাথমিক মোবাইল নম্বর হিসেবে ০১৩২৯-৬৩০৫৪১ দেওয়া রয়েছে। অপরদিকে, জমজম হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অফিশিয়াল প্রচারণামূলক ব্যানারে ‘নির্বাহী পরিচালক’ হিসেবে একই ব্যক্তির ছবি, ‘মোঃ রবিউল সরকার’ নাম এবং হুবহু একই মোবাইল নম্বর (০১৩২৯-৬৩০৫৪১) ব্যবহার করা হয়েছে।
একটি ফার্নিচার তৈরির দোকানের প্রোপাইটর থেকে সরাসরি কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক পদে আসার পেছনে ন্যূনতম কোনো স্বাস্থ্য বিষয়ক ডিগ্রি বা প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছিল কিনা, তা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা ও প্রশাসনিক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
ব্যানারের অমিল, অসঙ্গতি ও ভুয়া হওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ
হাসপাতালটির প্রচারিত ব্যানার পর্যবেক্ষণ করলে একাধিক কারিগরি ও পেশাগত জালিয়াতির আলামত স্পষ্ট হয়:
- মেডিকেল গ্রাফিক্সের অসামঞ্জস্য (গুগল ভেক্টরের অনুলিপি): ব্যানারে ছয়জন চিকিৎসকের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকলেও ষষ্ঠ খোপটিতে (ডাঃ জাকিয়া সুলতানা-এর পাশের খালি বক্সে) কোনো চিকিৎসকের ছবি না দিয়ে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করা একটি সাধারণ স্টেথোস্কোপের ভেক্টর ছবি বসিয়ে খালি জায়গা পূরণ করা হয়েছে। এছাড়া নিচের কোণে ব্যবহৃত জলছাপ (যেমন ডান পাশের ZCHS লোগো) ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতকৃত টেমপ্লেট থেকে নকল করার ইঙ্গিত দেয়।
- যোগ্যতা ও উপাধির ব্যবহারের ঘাটতি: ‘মোঃ রবিউল সরকার’ নিজেকে ‘নির্বাহী পরিচালক’ হিসেবে দাবি করলেও তাঁর নামের সাথে কোনো স্বীকৃত মেডিকেল বা প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি উল্লেখ করা হয়নি। আইনগতভাবে কোনো মানসম্পন্ন হাসপাতালের শীর্ষে থাকা ব্যক্তির প্রশাসনিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত যোগ্যতা স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক।
- বিএমডিসি (BMDC) রেজিস্ট্রেশন নম্বর না থাকা: ব্যানারে প্রদর্শিত চিকিৎসকদের সিংহভাগের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC)-এর নিবন্ধন নম্বর অনুপস্থিত (কেবল একজন চিকিৎসকের ক্ষেত্রে তা দেখা গেছে)। কোনো হাসপাতালে চিকিৎসকদের প্রচারণায় বিএমডিসি নম্বর গোপন রাখা বা উল্লেখ না করা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত।
- ডিগ্রি ও ডিজাইনের অপেশাদারত্ব: ব্যানারের ফন্ট সাইজ, মার্জিন ও কালার স্কিম অত্যন্ত নিম্নমানের, যা সচরাচর অননুমোদিত বা ভুয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো মোবাইল অ্যাপ বা সাধারণ গ্রাফিক্স দোকান দিয়ে বানিয়ে থাকে। এছাড়া পদবির পাশে ব্যবহৃত ডিগ্রি ও কোর্সের সংক্ষেপণ (যেমন— পিজিটি, সিসিডি ইত্যাদি) উপস্থাপনে মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
জনস্বার্থে সতর্কতা
কসবার উক্ত হাসপাতাল সম্পর্কিত কথিত মৃত্যুর অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তাধীন না হলেও, ব্ল্যাক লেন্সের এই অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যাদি প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ভিত্তি ও প্রচার পদ্ধতি অত্যন্ত ভুয়া ও ভূতুড়ে। সাধারণ নাগরিকদের যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ বা পরামর্শ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিএমডিসি (BMDC) নম্বর যাচাই করা এবং উক্ত হাসপাতালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর বৈধ লাইসেন্স ও অনুমোদন রয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।