কসবায় স্কুলশিক্ষিকাকে পিস্তল ঠেকিয়ে অপহরণচেষ্টার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ফেসবুক লাইভে পাল্টা দাবি তুলেছেন অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন জিন্না। ১১ মিনিটের বক্তব্যে মেসেঞ্জার চ্যাট ও ডিজিটাল প্রমাণ প্রদর্শনের দাবি করে তিনি অভিযোগকে পূর্ববিরোধ বলে আখ্যা দেন। তদন্তের অপেক্ষায় পুলিশ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় এক সহকারী স্কুলশিক্ষিকাকে প্রকাশ্যে দিবালোকে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় দেলোয়ার হোসেন জিন্না (৩০)-সহ অজ্ঞাত সহযোগীদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পর বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত জিন্না; একই সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ ও চক্রান্তের দাবি তুলে ডিজিটাল নথি প্রদর্শনের মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন তিনি।
শিক্ষিকার দায়ের করা অভিযোগ ও বিবরণ
কসবা থানায় দায়েরকৃত অভিযোগপত্র (এসডিআর নম্বর-৩২০৭) সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী নুসরাত জাহান শান্তা (২৬) কসবা পশ্চিম ইউনিয়নের আকছিনা কুল্লাবাড়ি মডার্ন হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা। গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে বিদ্যালয় ছুটির পর বাড়ি ফেরার পথে আকছিনা এলাকার মৃত আব্দুল হক চেয়ারম্যানের বাড়ির পশ্চিম পাশে তার গতিরোধ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কুল্লাবাড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেন জিন্না কোমর থেকে পিস্তল বের করে শিক্ষিকার পেটে ঠেকায় এবং তার এক অজ্ঞাত সহযোগী মুখ চেপে ধরে জোরপূর্বক একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নেয়। চিৎকার করতে চাইলে গলায় ছুরি ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গাড়িটি কুল্লাবাড়ি জোড় ব্রিজের ওপর পৌঁছালে শিক্ষিকা চলন্ত গাড়ি থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে প্রাণরক্ষা করেন এবং পথচারীদের সহায়তায় উদ্ধার হন। এ ঘটনায় আইনের আশ্রয় নিলে পরিবারসহ বড় ধরনের ক্ষতিসাধনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
ফেসবুক লাইভে অভিযুক্ত জিন্নার বক্তব্য ও পাল্টা দাবি
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন জিন্না। প্রায় ১১ মিনিটের ওই ভিডিও বক্তব্যে তিনি অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
লাইভে তিনি যেসকল বিষয় দাবি করেন:
- অপহরণের অভিযোগ ভিত্তিহীন: দিনদুপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র ঠেকিয়ে অপহরণের মতো ঘটনা সম্পূর্ণ অবাস্তব। এমন ঘটনা ঘটলে প্রত্যক্ষদর্শী কিংবা কোনো প্রমাণ থাকত। তিনি এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
- সম্পর্ক ও বিরোধের সূত্রপাত: “এক হাতে কখনো তালি বাজে না”—মন্তব্য করে তিনি অভিযোগকারীর সাথে পূর্বপরিচয় ও যোগাযোগের ইঙ্গিত দেন। তার দাবি, তাকে একটি বিশেষ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি গ্রহণ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই মিথ্যা অভিযোগ সাজানো হয়েছে।
- প্রমাণ উপস্থাপনের দাবি: লাইভ চলাকালে তিনি বেশ কিছু প্রিন্ট করা কাগজপত্র ও মোবাইলের স্ক্রিনশট প্রদর্শন করেন। তিনি দাবি করেন, উভয়ের মধ্যবর্তী মেসেঞ্জার কথোপকথন, ভয়েস রেকর্ড ও ফোনকলের সম্পূর্ণ তথ্যপ্রমাণ তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ চাইলে তিনি তা সরবরাহ করবেন।
- দলীয় অবস্থান ও অব্যাহতি: নিজেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের স্থানীয় পর্যায়ের পদধারী কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে জিন্না বলেন, “কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় দল নেবে না।” অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ না করা পর্যন্ত তিনি সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার কথা জানান।
- আইনের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি: তিনি জানান, পুলিশ বা স্থানীয় মুরব্বিরা ডাকলে তিনি যেকোনো সময় উপস্থিত হয়ে আইনি প্রক্রিয়া ও তদন্তে পূর্ণ সহায়তা এবং প্রয়োজনে আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত রয়েছেন।
অতীতে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ ও স্থানীয় উদ্বেগ
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন জিন্নার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৩ সালে আড়াইবাড়ি এলাকার এক কলেজছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও গোপনে ধারণ করে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। সে সময় ঘটনাটি আরটিভি ও চ্যানেল ২৪-সহ জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
অতীতে জামিনে বেরিয়ে আসার পর তার গতিবিধি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ ছিল। সাম্প্রতিক ঘটনায় নতুন করে অভিযোগ ওঠার পর কসবার সচেতন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক নীরবতা ও অনুসন্ধানী দৃষ্টি
ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগী পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে সামাজিক মাধ্যমে নিজের ব্যাখ্যা তুলে ধরে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করছেন।
অভিযোগের অগ্রগতি এবং অভিযুক্তের পাল্টা দাবির বিষয়ে জানতে কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে দায়িত্বশীল একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, সীমান্ত এলাকা হিসেবে কসবার মাদক ও চোরাচালানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ দমনে স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতায় শিথিলতার কারণে চিহ্নিত অপরাধীরা বারবার সুযোগ পেয়ে থাকে।
একদিকে একজন নারী শিক্ষিকার প্রকাশ্যে অপহরণচেষ্টার মতো গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্তের ব্যক্তিগত বিরোধ ও ডিজিটাল প্রমাণের পাল্টা দাবি—সব মিলিয়ে ঘটনাটির রহস্য উদঘাটনে পক্ষপাতহীন পুলিশি তদন্ত ও ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
