Categories: CrimesFact CheckNews

দুর্গাপুরে পুকুর খননে শেষ সম্বলটুকু হারাচ্ছে সাধারণ কৃষক।

দুর্গাপুর প্রতিনিধি | ব্ল্যাক লেন্স ২.০

এক সময় রাজশাহীর দুর্গাপুর ছিল বিল-খাল, ফসলি মাঠ আর কৃষকের হাসিতে ভরা জনপদ। চোখ জুড়ানো সবুজ ধানক্ষেত, বর্ষার পানিতে ভরা খাল-বিল আর মাটির গন্ধে মিশে থাকা জীবনের গল্প—সে চেনা দুর্গাপুর আজ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। গত এক যুগ ধরে লাগামহীন পুকুর খননের আগ্রাসনে ধ্বংসের মুখে পড়েছে এই কৃষিভিত্তিক জনপদ। বিল-খাল ভরাট হচ্ছে, কৃষি জমি পরিণত হচ্ছে গভীর জলাশয়ে, আর কৃষক হারাচ্ছেন তাদের শেষ সম্বল।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় খাল ভরাট করে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে, বিলের মাঝখানে রাতের আঁধারে চলছে অবৈধ পুকুর খনন। খনন করা মাটি বিক্রি হচ্ছে ইটভাটায়। এতে লাভবান হচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, অথচ কৃষি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে কৃষক পরিবারগুলো। বিল-খালের পানি ধারণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই আশপাশের গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগের তীর গিয়ে ঠেকছে তাহেরপুর এলাকার যুবদল নেতা বেলাল হোসেন ওরফে ‘ব্যাটারি বেলাল’-এর দিকে। স্থানীয়দের দাবি, তার নেতৃত্বেই উজানখলশি বিলসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পুকুর খনন চলছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে কখনো ভয়ভীতি, কখনো লোভ দেখিয়ে কৃষকের জমি দখলে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই জমির মালিকদের না জানিয়ে একসঙ্গে প্রায় ১৩০ বিঘা ফসলি জমিতে পাঁচটি এক্সকাভেটর (ভেকু) নামিয়ে খনন কাজ শুরু করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে প্রভাব দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। সামাজিক চাপ আর ভয়ভীতির কারণে বহু কৃষক প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।অভিযোগ রয়েছে, বিঘা চুক্তিতে কৃষকের জমি পুকুরে রূপান্তর করে সেই পুকুরই পরে উচ্চ দামে মৎস্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে সিন্ডিকেটের পকেট ভারী হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকের জীবনের ভিত্তিটাই ভেঙে পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে ফসল, ভেঙে পড়ছে এলাকার কৃষি ব্যবস্থা।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জমির শ্রেণি পরিবর্তন দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও, অভিযোগ আছে—প্রশাসনের নজর এড়িয়ে রাত কিংবা ছুটির দিনে অবৈধ খনন অব্যাহত রাখা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে দুর্গাপুর উপজেলার ২নং কিসমত গণৈকড় ইউনিয়নের উজানখলশি পূর্বপাড়া গ্রামসংলগ্ন বিলে জোরপূর্বক পুকুর খননের সময় স্থানীয় কৃষকরা প্রতিরোধ গড়ে তুললে খননকারীরা পালিয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী চারটি ভেকু গাড়িতে আগুন দেয়। একটি ভেকু সম্পূর্ণ পুড়ে যায় এবং তিনটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্থানীয়রা জানান, এর আগেও এই চক্র শতশত বিঘা জমি পুকুরে পরিণত করেছে। এর ফলে রাতুগ্রাম, বড়ইল, বাদইলসহ আশপাশের একাধিক গ্রাম বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত প্লাবিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, দিনে লুকোচুরি করে আর রাতে খোলাখুলি অবৈধ খনন এখনও চলছেই।অভিযুক্ত বেলাল হোসেন ওরফে ‘ব্যাটারি বেলাল’ অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কিছু ব্যক্তি তার কাছে টাকা দাবি করেছিলেন। দাবি পূরণ না করায় পরিকল্পিতভাবে তার ভেকুতে আগুন দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনায় জড়িতরা জমির প্রকৃত মালিক নন। তবে দু–একজন মালিক থাকতে পারেন, যাদের কাছ থেকে সরাসরি লিজ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, জমির কোনো শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়নি এবং প্রশাসনের কোনো লিখিত অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। বর্ষায় সেখানে স্বাভাবিকভাবে পানি জমে, যেখানে দরিদ্র মানুষ মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার দাবি, মূলত তারাই বাধা দিচ্ছেন। তিনি সাংবাদিকদের সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনেরও আহ্বান জানান।

এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর সোমবার উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অবৈধ পুকুর খননের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে একটি ভেকুর ব্যাটারি জব্দ করা হয়। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে সাময়িক বিরতি এলেও সিন্ডিকেটের মূল কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।এ বিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজু বলেন,“ফসলি জমি ও জীবিকার ওপর যখন সরাসরি আঘাত আসে, তখন সাধারণ কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আমরা বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছি। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য—যারা আইন অমান্য করে অবৈধভাবে পুকুর খননের মাধ্যমে কৃষিজমি ধ্বংস করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।”তিনি আরও বলেন, কৃষকদের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে বিস্তারিত তদন্ত চলছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অবৈধ পুকুর খননের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কৃষিজমি রক্ষা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব থেকেই প্রশাসন কাজ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।স্থানীয় কৃষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুর এই অবস্থান তাদের কিছুটা হলেও সাহস জুগিয়েছে। তারা আশা করছেন, প্রশাসনের এই দৃঢ়তা অব্যাহত থাকলে অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠবে।

ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ কৃষকরা একত্রিত হয়ে অবৈধ পুকুর খনন বন্ধের দাবিতে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এলাকাবাসীর আশঙ্কা—দ্রুত শক্ত আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দুর্গাপুরের বিল-খাল, কৃষিজমি আর গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য চিরতরে হারিয়ে যাবে।

Blens25

Recent Posts

সারাদেশে দৈনিক গড় খুন ১০ জনঃ আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রত্যাবর্তন ও পুরোনো শকুনের নতুন শিকার?

মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, সম্পাদক ও প্রকাশক ব্ল্যাক লেন্স ২.০ | 25-08-2026 রাজপথ এখন যেন এক…

2 weeks ago

KASBA_CNG_DRIVER_MURDER_CASE_DOSSIER

Case Dossier: BL-2026-INV-KASBA-001X Top Secret // Law Enforcement & Judicial Eyes Only Case File: BL-2026-INV-KASBA-001X…

3 weeks ago

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় সিএনজি চালক হত্যা: ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ চক্রের সন্দেহভাজন দুই সদস্য গ্রেপ্তার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় চেতনানাশক প্রয়োগ করে সিএনজি অটোরিকশা চালক হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে…

3 weeks ago

দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ হওয়া মাহিনের সন্ধান চেয়ে পিতা মাতার আকুতি।

Missing Child Mahin: প্রথম পুত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা দরিদ্র পরিবার, উদ্ধারে আকুল আবেদন - ব্ল্যাকলেন্স…

1 month ago

কাঠমিস্ত্রি থেকে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক………

কাঠমিস্ত্রি থেকে হাসপাতালের CEO: কসবায় ভুল চিকিৎসায় মা-নবজাতকের মৃত্যুর গুঞ্জনে জমজম হাসপাতালের অনিয়ম উন্মোচন অনুসন্ধানী…

1 month ago