‘ব্ল্যাক লেন্স’ অনুসন্ধান: প্রশাসনের ছায়াতলে মানচিত্র বদলে দেওয়ার মহোৎসব (অনুসন্ধানী প্রতিবেদন)

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ফসলি জমি ও নদী এখন কেবল ভূ-দস্যুদের চারণভূমি নয়, বরং এটি এক সুসংগঠিত প্রশাসনিক ব্যর্থতার দলিলে পরিণত হয়েছে। ‘ব্ল্যাক লেন্স’ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কীভাবে মহাকাশ থেকে দেখা একটি সবুজ জনপদ গত কয়েক বছরে বিশাল বিশাল ‘ব্ল্যাক স্পট’ বা হ্রদে পরিণত হয়েছে [৩, ৪, ৯]। এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ছামিউল ইসলামের দায়বদ্ধতা ও প্রশাসনের ভূমিকা এখন চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ [২]।

স্যাটেলাইট ইমেজে ধ্বংসের মহাকাব্য: ২০১৯ বনাম ২০২৫

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত স্যাটেলাইট চিত্রগুলো কসবার ভৌগোলিক পরিবর্তনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে:

১. ধর্মপুর ও খিদিরপুর: ২০১৯ সালে যেখানে নিরেট সবুজ ফসলি জমি ছিল, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের চিত্রে সেখানে জ্যামিতিক হারে ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছে [১, ৩, ৩১]। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাটি তুলে নেওয়ার ফলে কৃষিজমির সীমানা এখন বিলীন [৫, ৪২]। ২. তালতলা ও গুরুহিত (বিজনা নদী): বিজনা নদীর একদম পাড় ঘেঁষে ড্রেজিং করার ফলে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং পাড় ভেঙে কৃষিজমি নদীতে মিশে যাচ্ছে [৬, ২১, ২৩]। ৩. শিকারপুরের ক্ষত: ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের ব্যবধানে শিকারপুরের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড কীভাবে সম্পূর্ণ ফাঁপা করে ফেলা হয়েছে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায় স্যাটেলাইট ফুটেজে [৮, ৭২]।

ড্রেজার মালিকের জবানবন্দি: ‘ম্যানেজ’ ও মুনাফার অংক

মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান ইউএনও ছামিউল ইসলামের দায়িত্বকালেই কসবায় সবচেয়ে বেশি বালি ও মাটি উত্তোলন হয়েছে [২]। অনুসন্ধানে একজন ড্রেজার মালিকের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার ভাষ্যমতে, উপজেলা প্রশাসন এবং তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনকে মাসিক ‘মাশুহারা’ বা মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে ম্যানেজ করেই এই অবৈধ ব্যবসা চালানো হতো [২]।

এই মালিকের দাবি অনুযায়ী, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যেমন—উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক স্বপন ও এন আপেলের সাথে মালিকানা শেয়ার এবং হস্তক্ষেপের মাধ্যমেই এই ‘সেফ জোন’ তৈরি করা হয়েছে [২]। যেখানে ধর্মপুর-খিদিরপুর সাইট থেকে এক দিনেই সর্বোচ্চ প্রায় ২৯ লক্ষ টাকার বালি উত্তোলনের রেকর্ড আছে, সেখানে প্রশাসন মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে [২, ১৩, ৪৮]। এই সামান্য জরিমানা বালি দস্যুদের কাছে কেবল একটি ‘অপারেটিং খরচ’ ছাড়া আর কিছু নয় [১৩, ৪৮]।

জনরোষ: ‘প্রশাসন কি দেখে না?’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কসবা উপজেলার সাধারণ মানুষের মন্তব্য বিশ্লেষণ করলে প্রশাসনের প্রতি চরম অনাস্থা লক্ষ্য করা যায় [১২, ৭৫, ৭৬]। ইউএনও-র কথিত অভিযানগুলোকে সাধারণ মানুষ ‘নাটক’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

ফেসবুক কমেন্টগুলোতে নাগরিকরা সরাসরি বলছেন:

• “এগুলো নাটক ছাড়া আর কিছু না… মাঠ পর্যায়ে বাস্তবে কোনো কিছু বাস্তবায়িত হয় না” [১২, ৭৬, ৮১]।

• “টাকার কাছে সবাই বিক্রি”—সাধারণ মানুষের এই মন্তব্য প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির দিকেই ইঙ্গিত করে [১২, ৭৬]।

• “ইউএনও সম্পর্কে এই উপজেলার সাধারণ মানুষ অনেক কিছুই জানে”—এমন মন্তব্যের মাধ্যমে সাধারণ জনতা বর্তমান প্রশাসনের নৈতিক অবস্থানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে [৭৬, ৮১]।

জাতীয় ঝুঁকি ও জীবনের মূল্য

বালি দস্যুতার এই মহোৎসব কেবল মাটির ক্ষতি করছে না, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে:

• বিদ্যুৎ বিপর্যয়: আশুগঞ্জ-কসবা ২৩০ কেভি বিদ্যুৎ টাওয়ারের গোড়া উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিড যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে [১০, ৪৩, ৫১]।

• অবকাঠামো ধ্বংস: সালদা ও বুড়ি নদীর ওপর নির্মিত সেতু ও কালভার্টগুলো এখন ধসের মুখে [১০, ৪৩]।

• মর্মান্তিক প্রাণহানি: ২০১৯ সালে অবৈধ ড্রেজিংয়ের ফলে টিলা ধসে কিফায়াতুল ইসলাম নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হলেও প্রশাসনের টনক নড়েনি [১১, ৪৪]।

উপসংহার (পর্ব ১): অনুসন্ধানী তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র প্রমাণ করে যে, কসবায় বর্তমানে যা ঘটছে তা প্রশাসনের অজানা নয়, বরং এক প্রকার মৌন সম্মতি বা পরোক্ষ সহযোগিতার ফল [২, ২৩, ৪২]। ইউএনও ছামিউল ইসলামের আমলেই কসবার পরিবেশগত বিপর্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে [২]। বালি খোরদের সম্পদের বিপরীতে এই নামমাত্র জরিমানা আসলে সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র [৪৮]। কসবার মানচিত্র রক্ষা করতে হলে এখনই সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও যৌথ বাহিনীর কঠোর অভিযান অপরিহার্য [১৪, ৫২, ৫৩]।

বি.দ্র. এই প্রতিবেদনটি স্যাটেলাইট তথ্য, ড্রেজার মালিকের বক্তব্য এবং সংগৃহীত গবেষণাপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।ইতিপূর্বে পকেট সাংবাদিকদের দিয়ে হুমকি প্রদর্শনের বিষয়গুলো আমাদের নথিভুক্ত।

Mohammad Mehedi Hasan

Recent Posts

কসবায় ৫ম শ্রেণির শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ: ফার্নিচার দোকানির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ৫ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় ফার্নিচার দোকান মালিক ইয়াসিন মিয়ার বিরুদ্ধে…

3 days ago

This website uses cookies.