শরি…ফুল ‘গভীর রাতের’ গল্প শুনিয়ে বানাতে চাচ্ছে ‘Fool’: কসবা সীমান্তে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে ৬০ বিজিবির দায়মুক্তির ভিত্তিহীন বয়ান ও অপকর্ম লুকানোর অপকৌশল!

কসবা সীমান্তে বিজিবির সরাসরি চোরাকারবারির সাথে জড়িত থেকে ট্রানজিট পাস দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। বিএসএফের বর্বরোচিত হামলা ও তরুণের মৃত্যু; ওএসআইএনটি (OSINT) ডেটা এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উন্মোচিত হচ্ছে আন্তঃদেশীয় মাদক সিন্ডিকেটের ভয়াবহ নকশা ও ব্যাটালিয়ন অধিনায়কের চরম জবাবদিহিহীনতার চিত্র।

মোহাম্মদ মেহেদী হাসান

ব্ল্যাক লেন্স ২.০

কসবা সীমান্তে ২০ বছর বয়সী তরুণ শিক্ষার্থী মুরসালিন নিহতের ঘটনায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৬০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম শরিফুল ইসলাম ঘটনাটিকে ‘গভীর রাতের চোরাচালানকারী ও বিএসএফের সাথে সংঘর্ষ’ বলে যে বয়ান দিয়েছেন, তথ্য-উপাত্ত এবং যুক্তির কষ্টিপাথরে তা প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোর এবং নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করার একটি দুর্বল ও ব্যঙ্গাত্মক মহড়া হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলত সীমান্ত সুরক্ষায় খোদ অধিনায়কের নেতৃত্ব ও জবাবদিহিহীনতাই চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে。

তথ্য ও যুক্তির কষ্টিপাথরে বিজিবি অধিনায়কের বয়ান

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুলতানপুর ৬০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম শরিফুল ইসলাম জানান:

“গভীর রাতে অন্তত ১৫ জন বাংলাদেশি ভারতীয় চোরাকারবারিদের সহায়তায় পাথারিয়াদ্বার সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের উদ্দেশ্যে ভারতের অভ্যন্তরে ২০০ গজ ভেতরে প্রবেশ করে। চোরাচালানি মাল নিয়ে আসার সময় ভারতের ৪৯ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের টহল দল তাদের বাধা দেয়। এ সময় বাংলাদেশি চোরাকারবারিরা বিএসএফ সদস্যদের ওপর চড়াও হয়।”

তিনি আরও বলেন:

“হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্য দুই রাউন্ড ছররা গুলি ছোড়েন। এতে মোরছালিন ও নবীর হোসেন গুরুতর আহত হন। পরে তাদের ভারতের ত্রিপুরার বিশালগড় মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দুই যুবকের মৃত্যু হয়। বিএসএফের পক্ষ থেকে বিষয়টি বিজিবিকে নিশ্চিত করা হয়েছে।”

অধিনায়কের এই বক্তব্য যদি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খণ্ডন করা হয়, তবে তার কমান্ডের চরম অসংগতিগুলো নিম্নরূপ দাঁড়ায়:

১. ঘটনার সময়কাল: অধিনায়কের ‘গভীর রাত’ বনাম প্রাপ্ত ডেটা

অধিনায়কের দাবি: ঘটনাটি ‘গভীর রাতে’ সংঘটিত হয়েছে।

তথ্যগত বৈপরীত্য: আগরতলা হাসপাতাল, ৪৯ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন এবং স্থানীয় বিভিন্ন পাবলিক ফুটেজ ও ওএসআইএনটি (OSINT) ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মুরসালিনকে বিশালগড় হাসপাতালে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয় ভারতীয় সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা ২০ মিনিট)। চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার প্রায় ২-৩ ঘণ্টা আগেই সীমান্তে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। অর্থাৎ, ঘটনাটি মোটেও গভীর রাতের ছিল না। ফলে লে. কর্নেল শরিফুল ইসলামের ‘গভীর রাত’-এর বয়ানটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপকৌশল বলে অনুমেয়।

২. চোরাচালানের গতিপ্রকৃতি (Modus Operandi) এবং ঘটনাস্থল

অধিনায়কের দাবি: বাংলাদেশিরা ভারতের ২০০ গজ ভেতরে প্রবেশ করে মাল নিয়ে আসছিল।

তথ্যগত বৈপরীত্য: সীমান্ত এলাকার সাধারণ চোরাচালান প্রক্রিয়ায় চোরাই পণ্য কখনো ভারতের দোকান বা বাড়িঘর থেকে চুরি করে আনা হয় না। এই কারবারের সাথে সমান্তরালভাবে ভারতীয় স্থানীয় মাদক-চোরাকারবারীরা জড়িত থাকে। ভারতীয় গডফাদাররা লেবার বা বাহক দ্বারা কাঁটাতারের কাছাকাছি বা কাঁটাতার পার করে দিয়ে থাকে। এছাড়া, ভারতের বিএসএফ মূলত ১৫০ গজের মধ্যেই তাদের দৈনন্দিন টহল কার্য পরিচালনা করে। ভারতের এত ভেতরে কাঁটাতারের এক-দেড়শ গজ অভ্যন্তরে নিজ দেশেই বিএসএফ কর্তৃক বাঙালি হত্যার নজির অত্যন্ত বিরল, যা অধিনায়কের দাবির যৌক্তিকতাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে。

৩. অধিনায়কের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং অজ্ঞাত ১৩ জনের অবস্থান

অধিনায়কের দাবি: অন্তত ১৫ জন চোরাকারবারি প্রবেশ করেছিল এবং বিএসএফের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়।

অমীমাংসিত প্রশ্ন: তিনি যেখানে ১৫ জন চোরাকারবারির কথা বলছেন এবং গভীর রাতে গুলির কথাও বলছেন, সেখানে সেই গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় দায়িত্বরত বিজিবি টহল দলের ভূমিকা কী ছিল? লে. কর্নেল এস এম শরিফুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন টহল দল কি তখন নিষ্ক্রিয় ছিল? ১৫ জনের মধ্য থেকে কতজনকে তার বাহিনী শনাক্ত করতে পেরেছে? এর কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তার বক্তব্যে নেই, যা তার কমান্ডের চরম ব্যর্থতা প্রমাণ করে।

৪. ‘চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু’ বনাম ভিজ্যুয়াল প্রমাণ

অধিনায়কের দাবি: চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজনের মৃত্যু হয়।

তথ্যগত বৈপরীত্য: তিনি তার বক্তব্যে বলেছেন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে, অথচ একটি ভ্যানে করে অত্যন্ত বিশ্রী ও অমানবিক কায়দায় লাশ নিয়ে বিজিবির ন্যাক্কারজনক টহলের মহড়ার ভিজ্যুয়াল ফুটেজ পাওয়া গেছে। এই প্রমাণ লে. কর্নেল শরিফুল ইসলামের বয়ানকে সরাসরি খণ্ডন করে।

৫. অধিনায়কের দায়ভার: কথিত প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব

স্থানীয় অভিযোগ:

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তির অভিযোগ, ৬০ বিজিবি ব্যাটালিয়ন ওই দেশের (ভারতে) কথিত ড্রাগলর্ড বা স্মাগলারদের সাথে সর্বদা একটি মাধ্যম ব্যবহার করে সুসম্পর্ক বজায় রেখে মাদক-চোরাকারবারিদের ট্রানজিট দিয়ে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই ড্রাগলর্ডরা ওই দেশের প্রশাসন ও বিজিবিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তাদের নেটওয়ার্ক এতই বড় যে, তারা সত্যকে মিথ্যা ও মিথ্যাকে সত্য করার সক্ষমতা রাখে।

বিশ্লেষণ: এই কথিত অভিযোগটি সরাসরি ৬০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। প্রভাবশালী আন্তঃদেশীয় এই সিন্ডিকেটগুলো নিজেদের অপরাধ ঢাকতে অধিনায়কের মাধ্যমেই বানোয়াট বয়ান তৈরি করতে সক্ষম বলে যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা খোদ অধিনায়কের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে একটি স্বাধীন তদন্তের দাবিকে জোরালো করে।

কাঁটাতারের ভূ-রাজনীতি ও সমান্তরাল অর্থনীতি: বিশেষজ্ঞ মত

সীমান্ত হত্যা এবং আন্তঃদেশীয় চোরাচালানের এই ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সায়েদুর রহমান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন:

“ভারতে কাঁটাতার নিয়ে অনেকেই অনেক সময় ভারতের কৌশলগত উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন। চোরাকারবারি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে। এই একই রুট ব্যবহার করে অনেক সময় অবৈধ মাদক ও অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঘটে। সীমান্তে দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতার অভাব এবং দায় এড়ানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, যা রাষ্ট্রের সুশাসন, আইনি শাসন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়।”

রাষ্ট্রের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড ধ্বংসের বিষয়ে তিনি আরও বলেন:

“যেকোনো রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি তার যুবসমাজ। মাদকের মূল লক্ষ্যবস্তু এই তরুণ প্রজন্ম। যুবসমাজ আসক্ত হলে রাষ্ট্রের কর্মক্ষমতা (Productivity) এবং ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যে দেশ থেকে মাদক প্রবেশ করে, কাঠামোগতভাবে তারাও নিরাপদ থাকে划 না। মাদক উৎপাদনকারী বা ট্রানজিট এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, গ্যাং-সহিংসতা এবং সমান্তরাল অবৈধ অর্থনীতির (Shadow economy) সৃষ্টি হয়, যা ওই দেশের স্থানীয় প্রশাসনকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। আর ভারত তাদের কাঁটাতারের সুবিধাটা ঠিক এই জায়গাতেই সর্বোচ্চ ভোগ করতে পারবে বলে আমি মনে করি।”

বিএসএফের পরোক্ষ দায় স্বীকার: নেপথ্যের ৩টি কৌশলগত কারণ

এই ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) খুব সহজেই পরোক্ষভাবে তাদের দায় স্বীকার করেছে। এর পেছনের কারণ জিজ্ঞেস করলে ড. সায়েদুর রহমান জানান, “এইখানে আমি মনে করি দুই বা দুইয়ের অধিক কারণ থাকতে পারে:

  1. তারা তাদের নিজেদের ক্ষমতার জানান দিলো আর পরোক্ষভাবে এই বার্তাই হয়তো দিতে চাচ্ছে—একটি বর্বর ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কীভাবে ঘটিয়ে তা আবার হজম করা যায়।
  2. সীমান্তে উত্তেজনা বজায় রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপর আভাস।
  3. ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থানীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের স্বরূপ তাদের নতুন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতার পটপরিবর্তন।

উপসংহার:

কসবা সীমান্তের এই ঘটনা কেবল দুটি প্রাণের অকালপ্রয়াণ নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনের সদিচ্ছা এবং রক্ষক বাহিনীর জবাবদিহিতার ওপর একটি চরম আঘাত। লে. কর্নেল এস এম শরিফুল ইসলামের দেওয়া দায়সারা ও ভিত্তিহীন বক্তব্য এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবিলম্বে এই ঘটনার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, যেখানে প্রথমেই ৬০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়কের এই দায়িত্বহীন বয়ান ও কথিত যোগসাজশের অভিযোগকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।