ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় প্রকাশ্যে দিবালোকে আকছিনা কুল্লাবাড়ি মডার্ন হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষিকাকে পিস্তল ঠেকিয়ে অপহরণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। চলন্ত সিএনজি থেকে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচেন শিক্ষিকা। অভিযুক্ত চিহ্নিত অপরাধী দেলোয়ার হোসেন জিন্নাহর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের হলেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় প্রকাশ্যে দিবালোকে এক সহকারী স্কুলশিক্ষিকাকে পিস্তল ঠেকিয়ে জোরপূর্বক সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে অপহরণচেষ্টার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কুল্লাবাড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেন জিন্না (৩০) ও তার অজ্ঞাত সহযোগীদের অভিযুক্ত করে গত সোমবার কসবা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলেও অভিযুক্তদের গ্রেফতারে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অস্ত্র ঠেকিয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা ও চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ
থানায় জমা দেওয়া অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী নুসরাত জাহান শান্তা (২৬) কসবা পশ্চিম ইউনিয়নের আকছিনা কুল্লাবাড়ি মডার্ন হাই স্কুলের একজন সহকারী শিক্ষিকা। গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে বিদ্যালয় ছুটির পর তিনি পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। আকছিনা এলাকার মৃত আব্দুল হক চেয়ারম্যানের বাড়ির পশ্চিম পাশে পৌঁছালে পূর্বে থেকেই ওত পেতে থাকা দেলোয়ার হোসেন জিন্না তার পথরোধ করে।
অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্ত জিন্না তার কোমর থেকে একটি কালো রঙের আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল) বের করে বাদীর পেটে ঠেকায় এবং অজ্ঞাতনামা এক সহযোগী মুখ চেপে ধরে তাকে জোরপূর্বক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে নেয়। গাড়িটি পশ্চিম দিকে দ্রুত ছুটতে থাকলে বাদী চিৎকার করার চেষ্টা করেন। এ সময় জিন্নার নির্দেশে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি তার গলায় ধারালো ছুরি ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। একপর্যায়ে গাড়িটি কুল্লাবাড়ি জোড় ব্রিজের ওপর পৌঁছালে প্রাণ বাঁচাতে শিক্ষিকা চলন্ত সিএনজি থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েন। স্থানীয় পথচারীরা শিক্ষিকার আর্তচিৎকারে এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন এবং স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করায় বাদীর পরিবারকে পুনরায় প্রাণনাশ ও ক্ষতিসাধনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযুক্ত জিন্নার অতীত অপরাধ রেকর্ড
অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন জিন্নার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বেও গুরুতর অপরাধের নজির রয়েছে। ২০২৩ সালে কসবার আড়াইবাড়ি এলাকার এক কলেজছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছিল। সে সময় ঘটনাটি আরটিভি ও চ্যানেল ২৪-সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে জেল খাটলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে জিন্না এলাকায় পুনরায় নারী নির্যাতন, বখাটেপনা ও চাঁদাবাজির মতো অসামাজিক চক্র গড়ে তোলে।
পুলিশের নীরবতা ও প্রশাসনিক প্রশ্ন
ঘটনার পর ভুক্তভোগী নিজেই বাদী হয়ে কসবা থানায় উপস্থিত হয়ে লিখিত অভিযোগ (এসডিআর নম্বর-৩২০৭) জমা দেন। তবে অভিযোগের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযোগ ও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী মোহাম্মদ রাশেদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অন্যদিকে, দায়িত্বশীল একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, সীমান্তঘেঁষা এ উপজেলায় মাদক কারবারিদের ট্রানজিট রুটের নিয়ন্ত্রণ ও নানা অনানুষ্ঠানিক সুবিধা ঘিরে স্থানীয় প্রশাসনের একটি অংশের সাথে অপরাধ চক্রের যোগসূত্রের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া বা দায়িত্বে শিথিলতার কারণেই চিহ্নিত অপরাধীরা বারবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠছে।
ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলার আনুষ্ঠানিক এজাহার গ্রহণ এবং মূল অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেন জিন্না ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
