কসবা সীমান্তে চোরাচালানের ত্রিপক্ষীয় অর্থায়ন পদ্ধতি: অনুসন্ধানে ছায়া-অর্থনীতির আংশিক চিত্র।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা কসবা অঞ্চলে চোরাচালান সিন্ডিকেটের আর্থিক লেনদেন ও পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছে ‘ব্ল্যাক লেন্স’ টিম। অনুসন্ধানের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই অবৈধ ছায়া অর্থনীতি পরিচালনায় মূলত তিন ধরনের অভিনব ও সুশৃঙ্খল আর্থিক লেনদেন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের পরোক্ষ ভূমিকার কারণে এই সীমান্ত চোরাকারবারী সিন্ডিকেটটি দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
১. চোরাচালানের ছায়া অর্থনীতি: অর্থ লেনদেনের ৩টি প্রধান মাধ্যম
ব্ল্যাক লেন্স টিমের সংগৃহীত তথ্য ও বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চোরাচালানের অর্থ বৈধ করার এবং সীমান্ত পারাপারের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটটি মূলত নিম্নলিখিত তিনটি পদ্ধতি অবলম্বন করছে:
- পণ্যের বিনিময় (Barter System): নগদ অর্থের ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশীয় পণ্য ভারতে পাচার করা হয় এবং তার বিনিময়ে ওপার থেকে অবৈধ মালামাল আনা হয়। পাচারকৃত পণ্যের তালিকায় অন্যতম প্রধান হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ, স্থানীয় জলাশয়ের মাছ, মশার কয়েল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।
- হুন্ডি (Hundi): আন্তর্জাতিক ও আন্তঃদেশীয় বড় অঙ্কের লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য অবৈধ ব্যাংকিং বা হুন্ডি চ্যানেল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সীমান্ত অঞ্চলের বড় বড় চালানের অর্থ কোনো দৃশ্যমান রেকর্ড ছাড়াই পাচার হয়ে যাচ্ছে।যার মধ্যে অন্যতম ট্রেড বেজড মানই লন্ডারিং।
- ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া স্বর্ণের বার (Gold Smuggling): মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে শুল্ক ও কর ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসা স্বর্ণের বার এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই স্বর্ণের বারগুলো কিছু তরুণ/যুবক/নতুন প্রবাসীদের দ্বারা, বহন করার জন্য বার প্রতি ১০০-১৫০ ইউএস ডলার এর বিনিময়ে এয়ারপোর্টের নিরাপত্তা চক্ষু ফাকি দিয়ে অল্প পরিমাণে (১-৫টি) দেশে আনা হচ্ছে। নির্ধারিত জায়গায় পৌঁছানোর পর এগুলো চোরাচালানের পেমেন্ট হিসেবে রূপান্তর করা হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।
২. সরেজমিন অনুসন্ধান: কসবা-সৈদাবাদ সড়কের পাশে গোপন বৈঠক
গত শনিবার (২৩ মে, ২০২৬) আনুমানিক রাত ১০:০০ মিনিটে চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের একটি আন্তঃজেলা সমন্বয় সভার খবর পায় ব্ল্যাক লেন্স টিম। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে টিমের সদস্যরা কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামের বটগাছের উত্তর দিকে, কসবা-সৈদাবাদ সড়কের পাশে কৌশলগত অবস্থান নেন।
- উপস্থিতি: প্রাথমিক সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ভারতে অবৈধভাবে পণ্য পাঠানোর রুট ও শিডিউল নির্ধারণের জন্য এই বৈঠকটি ডাকা হয়েছিল। সেখানে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, শীর্ষস্থানীয় অভিযুক্ত চোরাকারবারি এবং ‘লাইন্সম্যান’ নুরুর কথিত সহযোগী হিসেবে পরিচিত গোলাম সারোয়ারসহ প্রায় ৮-১০ জন উপস্থিত ছিলেন।
- সময়কাল: বৈঠকটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দীর্ঘায়িত হয় এবং মধ্যরাত প্রায় ১২:০০ টা পর্যন্ত তাদের আলোচনা চলে।
- যোগাযোগের চেষ্টা: বৈঠক চলাকালীন ব্ল্যাক লেন্স টিমের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত গোলাম সারোয়ারসহ অজ্ঞাত পরিচয়হীন আরও দুইজনের সাথে সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে একজন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত হলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে ব্ল্যাক লেন্স ধারনা করে। এবং নিরাপত্তার স্বার্থে অবস্থান থেকে সরে আসে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের স্বার্থে ব্ল্যাক লেন্স টিম অনতিবিলম্বে স্থানীয় কসবা থানার সাথে যোগাযোগ করে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে।দায়িত্বরত কসবা থানার ঊর্ধতন কর্মকর্তা বিষয়টি আমলে নিয়ে সাব-ইন্সপেক্টুর শামীম কে দায়িত্ব দেন অভিযোগ তদন্তের। তবে ঘটনার সময় কসবা থানার দায়িত্বরত সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) উক্ত শামীম হোসেন পক্ষনেই ফোন কলে জানান যে, “কোনো প্রকার রিকভারি যেমন মাদক ছাড়া তাদের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে গিয়ে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব নয়।” এস আই শামীমকে তখন উক্ত মিটিং এর চোরাকারবারীদের কথোপকথনের ভয়েজ রেকর্ডসহ সংস্লিষ্ঠ প্রমাণ সরবরাহ করতে রাজি হলেও তিনি জানান “এইটা তো ভাই অনলাইন ক্যাসিনো খেলার মতো ঘটনা। যদি এইখানে মাদক বা অন্যান্য কোনকিছু থাকে তাহলে বললে আসতে পারি”
পরবর্তীতে সাব-ইন্সপেক্টর শামীমের সাথে চোরাকারবারীদের সুসম্পর্কের ও যোগসাজশের প্রমাণ পায় ব্ল্যাক লেন্স। এছাড়াও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ এইটাই ইংগিত দেয় যে বদলি হওয়া অফিসার ইনচারজ আব্দুল কাদের এর নেতৃত্বে পূর্বে এই সিন্ডিকেট আবারো প্রকাশ্যেই সচল হতে যাচ্ছে বা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন অবস্থান ছাড়োয়ারসহ অন্যান্য অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা বা অনীহাকে নির্দেশ করে, যা সীমান্ত সুরক্ষাকে দুর্বল করছে।
তবে সামগ্রিক সীমান্ত চোরাচালান এবং এর মাধ্যমে সৃষ্ট ছায়া অর্থনীতির বিষয়ে কসবা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রিপন দাশের নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রদান করেন।
“মানি লন্ডারিং বা এমন চোরাকারবারির অর্থের প্রবাহ নিয়ে আমাদের পুলিশের কিছুটা আইনগত বা প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও, মানি লন্ডারিংয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুতর বিষয় নিয়ে আমরা ইতিপূর্বেই সংশ্লিষ্ট বিশেষায়িত বিভাগের সাথে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করে কাজ করছি। এবং আমরা কসবা থানার অন্তর্গত সন্দেহভাজন কয়েকজনের তথ্য পুলিশের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের নিকট প্রেরণ করেছি এবং তাঁরা এইটা নিয়ে কাজ করছে। ” — রিপন দাশ, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত), কসবা থানা
৪. অভিযুক্তের অতীত রেকর্ড ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ধারাবাহিকতা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অভিযুক্ত গোলাম সারোয়ারের চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি তার পৃষ্ঠপোষকতার উৎস পরিবর্তন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে:
- পূর্ববর্তী রেকর্ড: তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিজ গ্রামের ইউপি সদস্য রবিন চৌধুরী এবং স্থানীয় দলীয় প্রভাবশালী নেতাদের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় তিনি চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
- যৌথ বাহিনীর অভিযান: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য ভারতে পাচার করার প্রাক্কালে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযানে গোলাম সারোয়ার বিপুল পরিমাণ মালামালসহ হাতেনাতে আটক হয়েছিলেন।
- বর্তমান পরিস্থিতি: আইনি প্রক্রিয়া শেষে জামিনে বা অন্য কোনো উপায়ে মুক্ত হয়ে, তিনি বর্তমানে পুনরায় স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় নিয়ে নিজের চোরাচালান সাম্রাজ্য পুনর্গঠন করছেন বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পরিচালিত এই ত্রিপক্ষীয় ছায়া অর্থনীতির মূল উৎপাটনে আরও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।