ফ্যাসিবাদী শাসনে ১২৪ মামলার আঘাত: মাহমুদুর রহমানের আপোষহীন বিপ্লবী লড়াই
ফ্যাসিবাদী শাসনে ১২৪ মামলার আঘাত: মাহমুদুর রহমানের আপোষহীন বিপ্লবী লড়াই
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে মাহমুদুর রহমান একটি নাম, একটি সংগ্রামের প্রতীক। গত দেড় দশকে তাকে যেভাবে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা সমসাময়িক বিশ্বে বিরল। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার এই অকুতোভয় সম্পাদকের কণ্ঠরোধ করতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেকর্ড সংখ্যক মামলা দায়ের করা হয়েছিল।আজকের ব্লগে আমরা তুলে ধরব কীভাবে ১২৪টিরও বেশি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দিয়ে একজন সত্যনিষ্ঠ সংবাদকর্মীর কলম থামিয়ে দেওয়ার ফ্যাসিবাদী চেষ্টা করা হয়েছিল।
মামলার পাহাড়: সংখ্যা যখন নিপীড়নের হাতিয়ার
একজন মানুষের বিরুদ্ধে কয়টি মামলা হতে পারে? ৫টি, ১০টি না কি ২০টি? মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ছিল অবিশ্বাস্য। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় তার বিরুদ্ধে মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং কালো আইনে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছিল।
মোট মামলার সংখ্যা: ১২৪টিরও বেশি (বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি)।
অভিযোগের ধরন: বেশিরভাগ মামলাই ছিল সাজানো মানহানি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—একই সংবাদের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মামলা করে তাকে আদালতের বারান্দায় দৌঁড়ে নিস্তেজ করে দেওয়া।
কেন এই আইনি আগ্রাসন?
মাহমুদুর রহমানের ওপর এই মামলার বন্যা শুরু হয় মূলত ২০১৩ সালে। আমার দেশ পত্রিকায় তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদী আচরণ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে সাহসী অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তিনি সরকারের প্রধান টার্গেটে পরিণত হন।
১. আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ ও কণ্ঠরোধ: ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে তাকে পত্রিকা অফিস থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং গায়ের জোরে ছাপাখানা সিলগালা করে দেওয়া হয়।
২. রিমান্ডের নামে পৈশাচিক নির্যাতন: গ্রেপ্তারের পর তাকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, রিমান্ডে তাকে অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, যা ছিল চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন।
৩. বাধ্যতামূলক নির্বাসন: দীর্ঘ সময় জেল খাটার পর জীবনের নিরাপত্তা ও চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
সাত বছরের কারাদণ্ড ও বিপ্লবী প্রত্যাবর্তন
মাহমুদুর রহমানের অনুপস্থিতিতেই তাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে ‘অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্র’ নামক এক নাটকীয় মামলায় সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এই মামলাটিকে তিনি শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে দাবি করে আসছিলেন।
গত ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের পর স্বৈরাচারের পতন হলে তিনি দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ২৯ সেপ্টেম্বর বীরের বেশে দেশে ফেরেন। আদালতে আত্মসমর্পণ করে জেল খাটলেও বর্তমানে তিনি জামিনে মুক্ত আছেন এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।
উপসংহার
একটি রাষ্ট্রে যখন সত্য বলা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তখন তার ফলাফল হয় মাহমুদুর রহমানের মতো ১২৪টি মামলার খড়গ। এই মামলাগুলো কেবল একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল না, বরং তা ছিল স্বাধীন গণমাধ্যম ও সত্যের কণ্ঠরোধ করার এক ঘৃণ্য নীলনকশা।
মাহমুদুর রহমান হার মানেননি। তিনি এখন নতুন উদ্যমে ‘আমার দেশ’ পত্রিকা চালু করার সংগ্রামে নেমেছেন। ইতিহাসের পাতায় এই ১২৪টি মামলা সবসময় ফ্যাসিবাদী শাসনের এক কালো অধ্যায় এবং একজন সাংবাদিকের আপোষহীন লড়াইয়ের দলিল হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।
