ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশ ইস্যুতে বক্তব্য রাখছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীভারতের লোকসভা(AI Generated)

বিশেষ প্রতিবেদন | ব্ল্যাক লেন্স ২.০ তারিখ: ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কসবা/ঢাকা: ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং লোকসভায় সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের লিখিত উত্তর প্রদান করেন। এসব উত্তরে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বর্তমান সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অবস্থানের প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ ও স্বাধীনতার প্রশ্ন

লোকসভার অধিবেশনে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্কের ধরন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক ‘স্পর্শকাতর’ কি না এবং পাকিস্তান এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভারতের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি করছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সরাসরি কোনো নেতিবাচক মন্তব্য না করলেও সর্তক অবস্থান ব্যক্ত করেন।

কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, “ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি অত্যন্ত গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এমনকি দুই দেশের মানুষের সামাজিক বন্ধনও অভিন্ন।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ভারতের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কটি ‘স্বতন্ত্র’। অর্থাৎ, অন্য কোনো তৃতীয় দেশ (যেমন পাকিস্তান বা চীন) এই সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে না এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অন্য দেশগুলোর প্রেক্ষাপট থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সার্বভৌম।

সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়টি লোকসভায় বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ভারতের সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কতটা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী তথ্য প্রদান করেন।

তিনি সংসদকে অবহিত করেন যে, ভারত ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি উত্থাপন করে আসছে। এটি কেবল সাধারণ কূটনৈতিক স্তরে নয়, বরং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে এই বিষয়টি বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকেও সংখ্যালঘুদের ওপর কথিত নির্যাতনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছিল। ভারতের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু স্বার্থ রক্ষা করাকে তাদের অন্যতম প্রধান কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।

চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ‘জোট’ ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ

লোকসভায় উত্থাপিত প্রশ্নের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ভারতের সংসদ সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান জোট ভারতের সীমানায় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করছে কি না। ভারতের সাথে দীর্ঘ সীমানা থাকা এই দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত কোনো পরিবর্তন আসছে কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়।

উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর যে কোনো প্রভাব পড়তে পারে— এমন সব বিষয়ের ওপর দিল্লি সার্বক্ষণিক নজরদারি (Monitored) করছে। প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোতে যা কিছু ঘটছে, তা ভারতের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বলয়ের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের অবকাঠামোগত ও কৌশলগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পুনরায় ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ (Neighborhood First) নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি জানান, এই নীতি অনুযায়ী ভারত সরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনা, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগ (People-to-people contact), ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখা ভারতের অন্যতম লক্ষ্য। তবে এই শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব ব্যক্ত করেন।

ব্ল্যাক লেন্স ২.০ বিশ্লেষণ

ভারতের লোকসভার এই আলোচনা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে: ১. ভারত সরকার বাংলাদেশের বর্তমান স্থিতিশীলতাকে তাদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। ২. সংখ্যালঘু ইস্যুটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কূটনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। ৩. আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে চীন বা পাকিস্তানের কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ভারত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে।

তৃণমূল পর্যায়ে এর প্রভাব এবং সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে কোনো বিশেষ পরিবর্তন আসছে কি না, সেদিকে Black Lens 2.0 নিয়মিত নজর রাখছে।

ভারতের লোকসভায় বাংলাদেশ ইস্যুতে বক্তব্য রাখছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

By Blens25

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *