মহেশখালীর কুতুবজোমে ৩য় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) নির্মাণে চীনা প্রতিষ্ঠান সিএনইই-এর প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব ফেরত পাঠিয়েছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অনুমোদনের আড়ালে নজিরবিহীন নথি ক্লোনিং, নিউইয়র্কের শেল কোম্পানি এনএস এনার্জি ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যের নাতির প্রভাব এবং ৭ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধান।
"Proposed NS Energy FSRU" অপরিবর্তিত ছিল এবং ওয়ার্ড ফাইলের বাইনারি স্ট্রিমে তারীফ রহমানের নাম ও এনএস এনার্জির অভ্যন্তরীণ টেমপ্লেট আইডি উদ্ধার করা হয়েছে।বিশেষ অনুসন্ধান ডেস্ক: মহেশখালীর কুতুবজোমে দেশের ৩য় ভাসমান এলএনজি রূপান্তরকরণ টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণকে ঘিরে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বড় ধরনের নাটকীয় মোড় নিয়েছে। জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) পদ্ধতির আড়ালে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিএনইই-এর পেশ করা প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিতর্কিত দরপ্রস্তাবটি অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে মহেশখালীতে ৩য় এফএসআরইউ স্থাপনে ‘চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোং লিমিটেড’ (সিএনইই)-এর দেওয়া দরটি অনুমোদনের জন্য তোলা হলে কমিটি তাতে সায় দেয়নি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নথিতে সিএনইই-কে সুপারিশকৃত দরদাতা হিসেবে দেখিয়ে ১৫ বছর মেয়াদে প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং ২০ বছর মেয়াদে প্রায় ১৩ হাজার ১৬১ কোটি টাকার ব্যয়ের প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল।
তবে আপাতদৃষ্টিতে একটি বড় উন্নয়ন প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক নাকচ মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে ডিজিটাল ফরেনসিক্সে ধরা পড়া নজিরবিহীন নথি জালিয়াতি, রাজনৈতিক শেল কোম্পানির প্রভাব এবং উন্মুক্ত দরপত্র এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অপচেষ্টা।
দেশে তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি (দৈনিক সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট) এবং সামিটের (৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট) দুটি টার্মিনাল রয়েছে। কোনো টার্মিনালে সামান্য কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলেই সারা দেশের গ্যাস সরবরাহ মুখ থুবড়ে পড়ে—যার সাম্প্রতিক প্রমাণ মিলেছিল গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের বৈদ্যুতিক ক্যাবলে অগ্নিকাণ্ডে দৈনিক ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায়।
এই সংকটের সুযোগ নিয়েই ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের ১২ মে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে হঠাৎ করেই একটি অযাচিত (unsolicited) প্রস্তাব জমা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিবন্ধিত অখ্যাত শেল কোম্পানি ‘এনএস এনার্জি নেভিগেশন’। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারীফ রহমান—যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের আপন নাতি। কোনো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়া সরাসরি জমা দেওয়া এই প্রস্তাবটি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই প্রাথমিক প্রশ্ন দেখা দেয়।
ঠিক ৩৮ দিন পর দৃশ্যের পট পরিবর্তন ঘটে। ১৯ জুন চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত পরাশক্তি সিএনইই একই কুতুবজোম টার্মিনালের জন্য জিটুজি চুক্তির আওতায় হুবহু একই প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়। সরকারি পর্যায়ের চুক্তির নাম দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র বাইপাস করা এবং রাজনৈতিক অস্বস্তি এড়ানোই ছিল এই কৌশলের মূল লক্ষ্য।
ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার টেবিলে সিএনইই-এর প্রস্তাবটি উঠতেই পুরো সাজানো নাটকের মুখোশ উন্মোচিত হয়। ফরেনসিক অডিট ও টেক্সট পর্যালোচনায় দেখা যায়, চীনা কোম্পানিটির দাখিলকৃত প্রস্তাবটি এনএস এনার্জির ১২ মের প্রস্তাবের হুবহু শব্দানুক্রমিক নকল (Verbatim Clone)। নথির মূল কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও শর্তাবলির ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বাক্য এবং ব্যাকরণগত বিন্যাস পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল।
প্রতারণার সবচেয়ে বড় ডিজিটাল ছাপ ধরা পড়ে চীনা প্রস্তাবের এনেক্সার-এ-তে সংযুক্ত টার্মিনালের সাইট ম্যাপে:
"Proposed NS Energy FSRU"।NSE_FSRU_Proposal_Template_v2.docx উদ্ধার করা হয়।ফরেনসিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি পরিষ্কার প্রমাণ করে যে চীনা প্রতিষ্ঠানটি কেবল সামনে একটি ‘কর্পোরেট পর্দা’ বা ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, পেছনের মূল সুবিধাভোগী ছিল ওই পরিবারকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট।
সিএনইই নিজেদের প্রস্তাবে বড় গলায় দাবি করেছিল, তারা মহেশখালীতে সামিট গ্রুপের টার্মিনাল-২ বাস্তবায়ন ও পরিচালনায় যুক্ত ছিল। কিন্তু সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামিটের সেই টার্মিনাল-২ চুক্তিটি পেট্রোবাংলা ২০২৪ সালের অক্টোবরেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করে দিয়েছিল। স্বয়ং সামিট গ্রুপও নিশ্চিত করেছে যে চীনা প্রতিষ্ঠানটি কখনোই তাদের ঠিকাদার বা অংশীদার ছিল না।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ডেটাবেস ক্লার্কসনস ও ইক্যাসিস ঘেঁটে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে সিএনইই-এর আজ পর্যন্ত একটিও নিজস্ব এফএসআরইউ পরিচালনা বা রূপান্তরের ট্র্যাক রেকর্ড নেই। তারা মূলত তৃতীয় কোনো পক্ষের জাহাজ ভাড়া করে এনে মাঝখানে দালালি করার ছক এঁকেছিল।
দরপ্রস্তাবের অঙ্ক বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় কেন মন্ত্রিসভা কমিটি শেষ পর্যন্ত এটি অনুমোদন করতে সাহস পায়নি:
| প্রকল্প / অপারেটর | দৈনিক ক্যাপাসিটি চার্জ (USD) | ১৫ বছরের মোট ব্যয় (টাকা) | মূল্যায়ন ও তারতম্য |
|---|---|---|---|
| সৌদি আরামকো আন্তর্জাতিক অফার | $১৯০,০০০ | ৳১২,৬৯১ কোটি | সর্বনিম্ন আন্তর্জাতিক বাজার দর |
| আরপিজিসিএল ফিজিবিলিটি বেঞ্চমার্ক | $২৩৯,৬৫৩ | ৳১৬,০০৭ কোটি | সরকারি সম্ভাব্যতা যাচাই ভিত্তি |
| সামিট টার্মিনাল-১ (মহেশখালী) | $২৪৯,১১৫ | ৳১৬,৬৩৯ কোটি | বর্তমানে কার্যকর চুক্তি |
| এক্সিলারেট এনার্জি (মহেশখালী) | $২৫৪,০০০ | ৳১৬,৯৬৫ কোটি | বর্তমানে কার্যকর চুক্তি |
| সিএনইই-এর প্রস্তাব (অপশন-এ) | $৩৪২,০০০ | ৳২২,৮৪৩ কোটি | +৪২.৭১% অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি! |
মহেশখালীতে ৩য় এই টার্মিনালকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক মহলেও অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরনপয়েন্টে আরও তিনটি টার্মিনাল করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা জানালেও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে আসছিল।
গত ৭ সেপ্টেম্বর এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন স্পষ্টভাবে জানান, এফএসআরইউ স্থাপনে একটি ‘স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক’ উন্মুক্ত দরপদ্ধতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেখানে আন্তর্জাতিক ও মার্কিন কোম্পানিগুলো অংশ নিতে আগ্রহী। জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রীও প্রতিশ্রুতি দেন যে সক্ষমতা দেখাতে পারলে প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তাবকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ-২০০৬) ও বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) অনুযায়ী যেখানে একাধিক আন্তর্জাতিক সাশ্রয়ী বিকল্প ছিল, সেখানে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় বা জিটুজি-র নামে এমন অস্বাভাবিক দর চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল গুরুতর আর্থিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী। এর সঙ্গে উচ্চ আদালত কর্তৃক দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ বিশেষ আইনের তথাকথিত ‘দায়মুক্তি’ ধারা বাতিল হয়ে যাওয়ায় এ ধরনের জালিয়াতিপূর্ণ নথির অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য বড় ধরনের ফৌজদারি দায় ডেকে আনতে পারত।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রস্তাবটি ফেরত পাঠানোয় আপাতত রাষ্ট্রের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা এড়ানো গেছে। তবে জ্বালানি ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, কীভাবে একটি বিতর্কিত শেল কোম্পানির মেটাডাটা ও সাইট ম্যাপ সম্বলিত জাল নথি মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায় পেরিয়ে ক্রয় কমিটি পর্যন্ত পৌঁছাল, তা খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন প্রশাসনিক ও ফরেনসিক তদন্ত জরুরি।
মহেশখালীর ৩য় এলএনজি এফএসআরইউ টার্মিনাল সিন্ডিকেটের ওপর পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট ও প্রমাণক ফাইল ডাউনলোড করুন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ৫ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় ফার্নিচার দোকান মালিক ইয়াসিন মিয়ার বিরুদ্ধে…
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় বসতভিটার জমি জবরদখল, ফলদ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা এবং বাধা দেওয়ায়…
ফরেনসিক গোয়েন্দা বিশেষ আপডেট কেস রেফারেন্স: BD-FININT-2026-NCL-089 কসবা বর্ডার ফাইলস: স্বর্ণ ও হুন্ডি চ্যানেলের মূল…
VERIFIED FORENSIC INTELLIGENCE UPDATE CASE: BD-FININT-2026-NCL-089 THE KASBA BORDER FILES: UNMASKING THE GOLD & HUNDI…
Breaking Border Dispatch: Incident unfolds during cross-border pursuit of designated smuggler at Ashabari zero line…
সীমান্তের আশাবাড়িতে মাদক কারবারিকে ধাওয়ার মুখে ঘটনা; আটক সদস্যদের ফিরিয়ে আনতে বিজিবি-বিএসএফ জরুরি পতাকা বৈঠক…
This website uses cookies.