সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের প্রথম কেনাকাটায় ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম এবং বাজারমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি দাম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৫৮ লাখ ৪৪ হাজার ১৩০ টাকা ব্যয়ে কেনা এসব সরঞ্জামের প্রকৃত বাজারমূল্য ২০ লাখ টাকারও কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নিচে ঘটনাটির একটি বিস্তারিত এবং বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
আর্থিক অসংগতি ও বাজারমূল্যের তুলনামূলক চিত্র
প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ বাজারমূল্যের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের অস্বাভাবিক ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রধান সরঞ্জামগুলোর তুলনামূলক মূল্যতালিকা নিচে দেওয়া হলো:

- ডিজিটাল স্টিল এসএলআর ক্যামেরা বডি (৪টি): প্রতিটি বডির প্রকৃত দাম প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার টাকা হলেও, বিল করা হয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৫০০ টাকা। ৪টি বডিতে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।
- ক্যামেরার ব্যাগ: সাধারণ বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা হলেও, বিল করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪০০ টাকা।
- স্পিডলাইট (ফ্ল্যাশ – ৬টি): বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১০-১৫ হাজার টাকা। তবে প্রতিটি ফ্ল্যাশের দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৫০ টাকা (মোট ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩০০ টাকা)।
- লেন্স (২৪-১২০ এমএম): বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৫ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। বিল করা হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার ৭০০ টাকা।
- লেন্স (১৪-২৪ এমএম): বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বিল করা হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২০০ টাকা।
- লেন্স (১০০-৪০০ এমএম): বাজারমূল্য প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বিল করা হয়েছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ২০০ টাকা।
- রিচার্জেবল ব্যাটারি: ৬টি ব্যাটারির প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৭৫ টাকা, যার সাধারণ বাজারমূল্য মাত্র ৯০০ থেকে ১,২০০ টাকার মধ্যে।
সরবরাহ প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়ম ও মানহীনতা
- ব্র্যান্ডিং জালিয়াতির অভিযোগ: প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নিম্নমানের ব্যাগে আলাদাভাবে দামি ব্র্যান্ডের লোগো বসানো হয়েছে। দরপত্রে জাপানি ব্র্যান্ড ‘নিক্কন’ (Nikon) সরবরাহের কথা থাকলেও, সরবরাহ করা হয়েছে ‘সিমপেক্স’ (Simpex) কোম্পানির পণ্য।
- অস্বাভাবিক দ্রুততা: নিয়ম অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে সরঞ্জাম সরবরাহের কথা থাকলেও, কার্যাদেশ (২৫ মার্চ) পাওয়ার পর মাত্র ১৯ দিনের মাথায় (১৫ এপ্রিল) তা সরবরাহ করা হয়।
- সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান: কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘সেফ ট্রেডার্স’, যার ঠিকানা মগবাজারে। প্রতিষ্ঠানটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা
- সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য: সেফ ট্রেডার্স-এর জিএম পরিচয়ে মিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, “দামি ব্র্যান্ড, ভ্যাট এবং ট্যাক্সের কারণে দাম বেশি পড়েছে এবং সরকারি কেনাকাটায় এমন দাম অস্বাভাবিক নয়।” তবে বাজারমূল্যের সঙ্গে বিশাল পার্থক্য এবং ভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।
- স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তার বক্তব্য: কার্যাদেশে স্বাক্ষরকারী সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. মহিদুল হক জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন এবং পদাধিকারবলে তাকে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। তার যোগদানের আগেই একটি কমিটির মতামতের ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল।
- সাবেক সচিবের ভূমিকা: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার অভিযোগ, সংসদ সচিবালয়ের সদ্য বিদায় নেওয়া সচিব কানিজ মাওলা নেপথ্যে থেকে এই কেনাকাটা তত্ত্বাবধান করেছেন। তবে কাগজে-কলমে সব নিয়ম মেনেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এ বিষয়ে কানিজ মাওলার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
পেশাদারদের বিশ্লেষণ
সংসদ সচিবালয়ের অধিবেশন কক্ষের মতো সীমাবদ্ধ জায়গায় ছবি তোলার জন্য এত বিপুল বাজেটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পেশাদার ফটোগ্রাফাররা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন ফটোগ্রাফারের মতে, সর্বোচ্চ ৪ থেকে ১০ লাখ টাকার ক্যামেরা সেট দিয়েই অধিবেশন কক্ষের ছবি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তোলা সম্ভব। সেখানে ৫৮ লাখ টাকার সরঞ্জাম ক্রয়কে তারা “একেবারে অস্বাভাবিক” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

