
মেহেদী হাসান, সম্পাদক ও সিইও, ব্ল্যাক লেন্স ২.০
কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া|
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তঘেঁষা উপজেলা কসবা। সাম্প্রতিক সময়ে এই জনপদ মাদক ও ভারতীয় চোরাকারবারিদের একটি ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের ওপার থেকে আসা গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিলের জোয়ার রুখতে প্রশাসন চেষ্টা করলেও এক ‘অদৃশ্য শক্তি’র দাপটে থমকে যাচ্ছে সব উদ্যোগ। ‘ব্ল্যাক লেন্স ২.০’-এর বিশেষ অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে কসবার মাদক সাম্রাজ্যের গভীর এক সিন্ডিকেট এবং এর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততা।
সীমান্তে অভিযান: আইনি সীমাবদ্ধতার সুযোগ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার সাথে কসবার দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত এলাকা অপরাধীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তৎপর থাকলেও মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভৌগোলিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক সীমান্তের ‘জিরো পয়েন্ট’-এর কাছাকাছি এলাকাগুলোতে আইনি জটিলতার কারণে চাইলেই পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে না। মাদক কারবারিরা এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে সীমান্ত এলাকায় মাদক মজুদ করে এবং পুলিশের নজরদারির বাইরে দিয়ে বিকল্প পথে সেগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়।







এসআই ফারুকের রেকর্ড সাফল্য: কসবার ইতিহাসে নজির
মাদকের এই ভয়াবহতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন কসবা থানার কিছু অকুতোভয় কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে এসআই ফারুক হোসেনের ভূমিকা অনন্য। অনুসন্ধানী তথ্যে উঠে এসেছে যে, এসআই ফারুক হোসেন গত ৮ মাসে কসবার ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক মাদকের চালান জব্দ করেছেন। একজন উপ-পরিদর্শকের হাতে মাত্র ৮ মাসে প্রায় ২ হাজার কেজি গাঁজা আটক হওয়ার এই অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে যে, ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে কসবা দিয়ে কী পরিমাণ মাদকের বিশাল চালান প্রতিদিন সারাদেশে পাচার হচ্ছে। তার এই ধারাবাহিক ও আপসহীন অভিযান কসবার মাদক যুদ্ধের ইতিহাসে যেমন নজির স্থাপন করেছে, তেমনি এই জনপদের মাদক পরিস্থিতির গভীরতাকেও জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।সচেতন মহলের মনে ঠিকই প্রশ্ন জাগে তাহলে আটক না হওয়া কিংবা সফলভাবে পাঁচার করা মাদক এর সংখ্যা টা কেমন হতে পারে?
নেপথ্যের কারিগর: কারা এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা?
প্রশ্ন জাগে, এত মাদক ধরা পড়লেও কেন নির্মূল হচ্ছে না এই চক্র? অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোতে মাদকের যত বড় বড় চালান ধরা পড়েছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আটক হয়েছে কেবল ‘বাহক’ বা দিনমজুর পর্যায়ের লেবাররা। মূল হোতারা সবসময়ই থেকে যায় অন্তরালে। যুক্তি বলছে, মাঝে মধ্যে যখন দুই-একজন মালিক পর্যায়ের ব্যক্তি ধরা পড়ে, তাদের পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা প্রায় প্রত্যেকেই রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
যেমন, কসবায় ৫৬ কেজি গাঁজার মালিক হিসেবে আটক হওয়া রুহুল আমিন—যিনি মাদক সম্রাট বাদশা জুয়েলের প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অন্যদিকে আখাউড়া উপজেলা যুবদল নেতা কামরুল হাসান। তাদের উভয়ের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে উঠে এসেছে বিতর্কিত নেতা কবির আহমেদ ভূঁইয়ার নাম, যার অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এরা দুজনেই।


গোপন সূত্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য: জুয়েলের ‘অদৃশ্য’ অপারেশন
ব্ল্যাক লেন্স ২.০-এর কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কসবার মাদক জগতের অভ্যন্তরীণ এক গোপন সূত্র অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছে। সেই সূত্রের দাবি অনুযায়ী:
“বাদশা জুয়েল অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তার সাম্রাজ্য পরিচালনা করে। সে কখনোই মাঠ পর্যায়ের লেবার বা বাহকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে না। বরং রুহুল আমিনের মতো নির্দিষ্ট কিছু ‘মালিক’ বা নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমেই সে পুরো অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করে। বাহকদের সাথে তার দূরত্ব বজায় রাখার এই কৌশলের কারণেই কোনো লেবার ধরা পড়লেও তদন্তে বাদশা জুয়েলের নাম আসার বা তার পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তা কার্যত বন্ধ থাকে। সে মূলত পর্দার আড়ালে থেকে পরোক্ষ ও অত্যন্ত সিক্রেট যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এই বিশাল মাদক সিন্ডিকেটের সুতো নাড়ায়।”



মাদকবিরোধী সংগঠনের উপর বাদশা জুয়েল এর প্রকাশ্যে হামলা:
তৃণমূল পর্যায়ে যখন ‘তাকবীর’-এর মতো মাদকবিরোধী সামাজিক সংগঠনগুলো জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করছে, তখন তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছে এই সিন্ডিকেট। গত ৪ অক্টোবর ২০২৫-এ চাটুয়াখালায় ‘তাকবীর’ প্রতিষ্ঠাতা ফাজলে রাব্বি তারেক ও তানভীরুল ইসলাম শাহীনের ওপর হামলার ঘটনায় এই বাদশা জুয়েলের সম্পৃক্ততার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।

রাজনৈতিক সংযোগ ও বিলাসী জীবন:
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাদশা জুয়েলের এই অদম্য শক্তির পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়। অভিযোগ উঠেছে, কসবা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল হক স্বপন এবং বিতর্কিত নেতা কবির আহমেদ ভূঁইয়ার সাথে বাদশা জুয়েলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল কাদেরের বক্তব্যেও এই প্রভাবশালী শক্তির কারণে তাকে দমানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ইঙ্গিতবহ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এই মাদক সিন্ডিকেটের কালো টাকা কি তবে স্থানীয় নেতাদের বিলাসবহুল জীবনযাপনের যোগান দিচ্ছে? রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মাদক সম্রাটের নিয়মিত উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
কসবার যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল বাহক নয়, বরং বাদশা জুয়েলের মতো গডফাদার এবং তাদের নেপথ্যে থাকা ‘অদৃশ্য শক্তি’র মুখ উন্মোচন করা জরুরি। সত্য প্রকাশে এবং সত্য সন্ধানে ব্ল্যাক লেন্স ২.০ সর্বদা আপসহীন।
সম্পূর্ণ অনুসন্ধানী ভিডিওটি দেখতে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন:
ভিডিও লিঙ্ক: কসবার মাদক ও সাধক – ব্ল্যাক লেন্স ২.০

