পুলিশ সংস্কার দৃশ্যমান, কিন্তু ডিজিএফআই? অন্ধকারের সমীকরণ এখনো জটিল

মোহাম্মদ মেহেদী হাসান

তারিখ: ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

জুলাই বিপ্লবের পর ‘সংস্কার’ শব্দটি আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে আলোচিত শব্দে পরিণত হয়েছে। গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল সরাতে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ প্রশাসনে যে বড় ধরনের রদবদল বা ‘মেজর সার্জারি’ চালিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের চোখে দৃশ্যমান। থানার ওসি থেকে শুরু করে আইজিপি—পুরো কাঠামো তছনছ করে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটা কি আমরা খেয়াল করছি?

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং ক্ষমতাধর অংশ—ডিজিএফআই (DGFI)-এর সংস্কার কতটুকু হলো? নাকি সংস্কারের নামে সেখানে কেবল ‘কসমেটিক সার্জারি’ চলছে?

পুলিশের সংস্কার কেন চোখে পড়ছে?

পুলিশ জনগণের সরাসরি সংস্পর্শে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ, থানা বা ডিবি—এদের কাজ ও পরিবর্তন আমরা রাস্তায় বা থানায় গেলে বুঝতে পারি। তাদের অনেকের বদলি, বরখাস্ত বা গ্রেপ্তারের খবর আমরা গণমাধ্যমে নিয়মিত পাচ্ছি। পুলিশকে ‘জনবান্ধব’ করার চেষ্টা অন্তত দৃশ্যমান।

ডিজিএফআই: অন্ধকারের আড়ালে কি সব ঠিক হয়ে গেছে?

সমস্যা হলো, ডিজিএফআই কাজ করে পর্দার আড়ালে। তাদের জবাবদিহিতা জনসম্মখে নেই। বিগত ১৬ বছরে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই সংস্থাকে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তা ছিল নজিরবিহীন।

১. ‘আয়নাঘর’ কালচার: গুম, বিচারবহির্ভূত আটক এবং দিনের পর দিন মানুষকে অদৃশ্য করে রাখার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার মাস্টারমাইন্ড ছিল এই সংস্থার কিছু বিপথগামী কর্মকর্তা।

২. পলিটিক্যাল উইং: রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চেয়ে ‘রাজনৈতিক বিরোধী দমন’ ছিল তাদের প্রধান কাজ। ফোনে আড়িপাতা, ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস করা এবং মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা ছিল নিত্যদিনের রুটিন।

প্রশ্ন হলো, ৫ আগস্টের পর শীর্ষ নেতৃত্ব বা ডিজি (DG) পরিবর্তন ছাড়া এই সংস্থার কাঠামোগত কী পরিবর্তন হয়েছে?

কেবল ‘মাথা’ বদলালেই কি ‘শরীর’ ঠিক হয়?

একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে সরিয়ে দিলেই ১৬ বছরের তৈরি করা ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) বা গভীর ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব নয়।

যারা মাঠ পর্যায়ে বসে বিরোধীদের তালিকা তৈরি করত, তারা কোথায়?

যেই কর্মকর্তারা মিডিয়া হাউসে ফোন করে নিউজ সেন্সর করত, তারা কি এখনো বহাল তবিয়তে নেই?

যেই টেকনিক্যাল টিম দিনের পর দিন নাগরিকদের ফোনে আড়িপেতেছে, সেই সেটআপ কি অকেজো করা হয়েছে?

আমাদের আশঙ্কা, পুলিশের মতো ডিজিএফআই-এর ভেতরে শুদ্ধি অভিযান ততটা জোরালো হয়নি। বরং সামরিক বাহিনীর অংশ হওয়ায় স্পর্শকাতরতার দোহাই দিয়ে অনেক কিছুই ধামাচাপা পড়ে আছে।

কেন এই সংস্কার জরুরি?

বর্তমান সরকার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য এটি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। পুলিশের ক্ষমতা সীমিত, কিন্তু একটি গোয়েন্দা সংস্থা যদি ভেতর থেকে অসহযোগিতা করে বা ভুল তথ্য দেয়, তবে যেকোনো সময় বড় ধরনের অন্তর্ঘাত (Sabotage) হতে পারে। ‘হাসিনার পকেটের লোক’ যারা এখনো ঘাপটি মেরে বসে আছে, তারা নিষ্ক্রিয় হয়েছে ভাবলে ভুল হবে। তারা সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে পারে।

শেষ কথা

পুলিশ সংস্কার নিয়ে আমরা যতটা সোচ্চার, গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার নিয়ে ততটাই নীরব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরীরে দৃশ্যমান ক্ষত সারানোর চেয়ে ভেতরের ক্যান্সার নির্মূল করা বেশি জরুরি। আমরা চাই ডিজিএফআই একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে কাজ করুক, কোনো দলের লাঠিয়াল বা গোয়েন্দা নজরদারির যন্ত্র হিসেবে নয়।

জনগণ জানতে চায়—আয়নাঘরের কারিগররা কি বিচারের আওতায় আসবে? নাকি তারা নতুন মোড়কে আবারও সক্রিয় হবে?

#StateReform #DGFI #BangladeshPolice #SecurityReform #BlackLensAnalysis

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *