কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধের তীব্র সংকট, একই ফর্দ দুইবার এন্ট্রি দিয়ে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার দ্বৈত দায়বদ্ধতা সৃষ্টি, ৪২.৫২% অভিন্ন গাণিতিক মূল্যবৃদ্ধি এবং হাসপাতালের ড্রপডাউনে ডিপিএইচই-এর ৯ কোটি টাকার প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির ওপর ব্ল্যাক লেন্স ২.০-এর বিশেষ অনুসন্ধানী গণতদন্ত প্রতিবেদন।
কসবা উপজেলা প্রতিনিধি ও অনুসন্ধানী সেল: কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে সাধারণ মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য যান, তখন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে কাউন্টারে দাঁড়ালেই অধিকাংশ সময় শুনতে হয় পরিচিত বাক্য—"এই ওষুধটি স্টোরে নেই, বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনুন।" অ্যান্টিবায়োটিক, সাধারণ ব্যথানাশক কিংবা স্যালাইন—এমনকি অতি সাধারণ গজ-ব্যান্ডেজও অনেক সময় রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হয়। অথচ সরকারি নথিপত্র আর জাতীয় ক্রয় পোর্টালের (e-GP) ভেতরের চিত্রটি ঠিক কতটা চোখ কপালে তোলার মতো? সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোটি কোটি টাকার কেনাকাটার প্রস্তাব উঠছে, ওষুধ আর যন্ত্রপাতির নামে বরাদ্দ হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালের স্টোর শূন্য, আর সাধারণ সেবাগ্রহীতারা বঞ্চিত।
'ব্ল্যাক লেন্স ২.০' (Black Lens 2.0)-এর অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসা সরকারি নথিপত্র, ডাটাবেস রেকর্ড এবং ই-জিপি পোর্টালের আনুষ্ঠানিক চুক্তিপত্র বিশ্লেষণ করে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কেনাকাটায় এমন তিনটি চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ও "ভোজবাজি" ধরা পড়েছে, যা জনস্বার্থে এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো:
সহজ কথায় ধরা যাক, আপনি প্রতি মাসের সংসারের বাজার করার জন্য একটি ফর্দ তৈরি করলেন। ফর্দে চাল, ডাল, তেল মিলিয়ে বাজেট হলো ৬৩ হাজার টাকা। কিন্তু আপনি খাতায় একই ফর্দ হুবহু দ্বিতীয়বার লিখে পরিবারের সবাইকে বললেন, বাজার করতে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা লাগবে!
ঠিক এই ঘটনাটিই ঘটেছে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের সরকারি বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় (APP ID 215938)। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়ার অনুমোদিত তালিকায় দেখা যায়, ৬টি আলাদা আলাদা খাতের কেনাকাটার পর হুবহু একই ফর্দ দ্বিতীয়বার তোলা হয়েছে:
| পণ্যের বিবরণ | প্রথম ফর্দের প্যাকেজ নং | দ্বিতীয় ফর্দের প্যাকেজ নং | বাজেট (টাকা) |
|---|---|---|---|
| জরুরি প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র (নন-ইডিসিএল) | Gr-2 (ID: 1220958) | GR-01 (ID: 1288689) | ২৬,২০,৭৬৫.০০ |
| অপারেশন ও সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি | Gr-3 (ID: 1220959) | GR-02 (ID: 1288692) | ১৪,৯৭,৫৮০.০০ |
| চিকিৎসা তুলা, গজ ও ব্যান্ডেজ | Gr-4 (ID: 1220960) | GR-03 (ID: 1288697) | ৭,৪৮,৭৯০.০০ |
| হাসপাতালের বিছানাপত্র ও লিনেন | Gr-5 (ID: 1220961) | GR-04 (ID: 1288698) | ৭,৪৮,৭৯০.০০ |
| ল্যাবরেটরির কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট | Gr-6 (ID: 1220962) | GR-05 (ID: 1288700) | ৪,৪৯,২৭৪.০০ |
| হাসপাতালের আসবাবপত্র ও ফার্নিচার | Gr-7 (ID: 1220963) | GR-06 (ID: 1288703) | ২,৯৯,৫১৬.০০ |
বাস্তব জগতে ওষুধের দাম যেভাবে বাড়ে, সুতির চাদরের দাম বা স্টিলের আলমারির দাম কি হুবহু একই হারে বাড়ে? সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে—না। পণ্যের মান, বাজারের চাহিদা এবং রোগী সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে সরকারি প্রাক্কলন আলাদা হওয়ার কথা।
কিন্তু কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট দেখলে মনে হবে, কোনো এক জাদুকর অফিসে বসে কম্পিউটারের ক্যালকুলেটরে আগের বছরের সব খরচকে ঠিক ১.৪২৫২১২৬ গুণ (৪২.৫২%) দিয়ে গুণ করে দিয়েছেন!
দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত এই হুবহু একই গাণিতিক স্কেলিং প্রমাণ করে—কসবায় হাসপাতালে কতজন রোগী আসছে বা বাজারে কোন জিনিসের কত দাম বেড়েছে, তার কোনো তথ্য বা মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা ছাড়াই সম্পূর্ণ কল্পিত ও কৃত্রিমভাবে টেবিল কালেকশনের মাধ্যমে বাজেট স্ফীত করা হয়েছে।
কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নামে সরকারি পোর্টালে মোট ৪৩টি কেনাকাটার তালিকা দেখানো হয়েছে, যার বাজেট ১৩ কোটি ৬৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। সাধারণ মানুষ ভাববেন, হাসপাতালটির উন্নয়নে বুঝি কত টাকাই না বরাদ্দ হয়েছে!
কিন্তু তথ্য ঘেঁটে দেখা গেল, এই সাড়ে ১৩ কোটির মধ্যে প্রায় ৯ কোটি টাকাই (৬৪.৬৯%) হাসপাতালের কাজ নয়! এগুলো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (DPHE) রাস্তাঘাটে টিউবওয়েল বসানো, বিদ্যালয়ের পানি পরীক্ষা এবং গ্রামীণ ল্যাট্রিন নির্মাণের কাজ। এমনকি ডিপিএইচই-এর একটি টিউবওয়েল প্রকল্পেও (PSWSC-5937) একই ফর্দ দুইবার লিখে ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ডুপ্লিকেশন (মোট ৩ কোটি ১৪ লাখ) করা হয়েছে!
পেশাদার সাংবাদিকতা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে 'ব্ল্যাক লেন্স ২.০' (Black Lens 2.0)-এর সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ মেহেদী হাসান-এর পক্ষ থেকে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডাঃ মোঃ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া-কে সরকারিভাবে বিস্তারিত তথ্য অনুসন্ধানের চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মেলেনি।
যেখানে প্রকৃত ওষুধের চাহিদা ছিল ৬৩ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৫ টাকা, সেখানে একই বিবরণ ও একই দাম ধরে দ্বিতীয়বার প্যাকেজ (GR-01 থেকে GR-06) অন্তর্ভুক্ত করে মোট ১ কোটি ২৭ লাখ ২৯ হাজার ৪৩০ টাকার দ্বৈত দায়বদ্ধতা তৈরির পেছনের প্রশাসনিক কারণ কী? প্রথম দরপত্র কি বাতিল হয়েছিল? বাতিল হলে তা সিস্টেমে প্রত্যাহার না করে গোপনে ফেলে রাখা হলো কেন?
সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির জিনিসপত্রের দাম একই হারে ঠিক ১.৪২৫২১২৬ গুণ বাড়ার পেছনের হিসাব কী? হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের গত তিন বছরের রোগীর সংখ্যা এবং ওষুধ বিতরণের রেজিস্টার খাতা কি এই ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের নলকূপ ও ল্যাট্রিনের ৩৯টি প্রকল্প কেন ঢুকিয়ে রাখা হলো? এই ভুলের কারণে যে সাধারণ মানুষ ভাবছে হাসপাতালে ১৩ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, তা সংশোধনে ডিজি হেলথ বা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট কর্তৃপক্ষকে (CPTU) কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি কি দেওয়া হয়েছিল?
সাধারণ দরিদ্র রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধের ঠিক কত শতাংশ বাস্তবে তাদের হাতে পৌঁছায়? ঠিকাদারের সরবরাহকৃত ওষুধের মান যাচাই ও স্টক রেজিস্টারের নিয়মিত অডিট কি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে যাচাই করা হয়েছে?
একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাশিদুল আলম-এর কাছেও কসবার প্রকল্পগুলো নিয়ে ৫টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল:
PSWSC-5937-এ একই নলকূপের কাজ দুইবার এন্ট্রি করে ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার দ্বিগুণ হিসাব (মোট ৩ কোটি ১৪ লাখ) দেখানোর পেছনের সত্য কী? কার্যাদেশ (NOA) কাকে দেওয়া হয়েছে?PEDP4/WQS-302) উন্মুক্ত দরপত্রে না দিয়ে মাত্র ৪.৫০ লাখ টাকা ধরে গোপনে কোটেশন (RFQ) পদ্ধতিতে দেওয়া হলো কেন?PSWSC-5953/5-এর আওতায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০টি আয়রন প্ল্যান্ট স্থাপনের সুনির্দিষ্ট স্থান নির্বাচনের প্রক্রিয়া কী?সরকারি ক্রয় আইন (PPA-2006) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR-2008) প্রণয়ন করা হয়েছিল জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি পয়সার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে। কিন্তু কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে যা ঘটছে, তা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়; বরং এর পেছনে গভীর কোনো আর্থিক কারসাজি ও অনিয়মের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।
যখন একজন দরিদ্র মা তার অসুস্থ সন্তানের জন্য জরুরি অ্যান্টিবায়োটিক হাসপাতালে না পেয়ে চোখে জল নিয়ে ফিরে যান, তখন সরকারি নথিতে কোটি টাকার ওষুধ কেনাকাটার দ্বৈত হিসাব তৈরি হওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডিপিএইচই নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে প্রেরিত আইনি চিঠি এবং পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানী অডিট রিপোর্ট ডাউনলোড করুন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ৫ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় ফার্নিচার দোকান মালিক ইয়াসিন মিয়ার বিরুদ্ধে…
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় বসতভিটার জমি জবরদখল, ফলদ ও বনজ গাছ কেটে ফেলা এবং বাধা দেওয়ায়…
ফরেনসিক গোয়েন্দা বিশেষ আপডেট কেস রেফারেন্স: BD-FININT-2026-NCL-089 কসবা বর্ডার ফাইলস: স্বর্ণ ও হুন্ডি চ্যানেলের মূল…
VERIFIED FORENSIC INTELLIGENCE UPDATE CASE: BD-FININT-2026-NCL-089 THE KASBA BORDER FILES: UNMASKING THE GOLD & HUNDI…
Breaking Border Dispatch: Incident unfolds during cross-border pursuit of designated smuggler at Ashabari zero line…
সীমান্তের আশাবাড়িতে মাদক কারবারিকে ধাওয়ার মুখে ঘটনা; আটক সদস্যদের ফিরিয়ে আনতে বিজিবি-বিএসএফ জরুরি পতাকা বৈঠক…
This website uses cookies.