১৫ দিনে ২৫ কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য: ওসির চেয়ার নিয়ে বিতর্ক ও তড়িঘড়ি প্রত্যাহারের খেলা

স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিভ ডসিয়ার | প্রাতিষ্ঠানিক অডিট ও নিরাপত্তা প্রশাসন

১৫ দিনে ২৫ কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য: ওসির চেয়ার নিয়ে বিতর্ক ও তড়িঘড়ি প্রত্যাহারের খেলা

বিশেষ শাখার (এসবি) সংবেদনশীল ক্লিয়ারেন্স ও গোপন প্রতিবেদন পাশ কাটিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসন। এক রেঞ্জ ডিআইজির শেষ ১৫ দিনে ৩০০+ এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল রদবদল। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা ও দমনপীড়নে অভিযুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের জবাবদিহিহীন বিদেশগমন ও শান্তিরক্ষা মিশনের সুবিধাজনক আশ্রয়।

📥 মূল তদন্ত প্রতিবেদন (PDF Dossier) ডাউনলোড করুন

ব্ল্যাক লেন্স বিশেষ অনুসন্ধান: রাষ্ট্রীয় একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর মূল ভিত্তি হলো পেশাদারিত্ব, সততা এবং অটুট চেইন-অব-কমান্ড। মাঠপর্যায়ে যখন নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়ার কথা, তখন পুলিশ প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী মহলে জায়গা করে নিচ্ছে কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য, অনৈতিক তদবির এবং ফাইলচাপা পড়া গোয়েন্দা প্রতিবেদন।

বিশেষ করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর বাহিনী যখন ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নামার কথা, তখন উল্টো অর্থ লেনদেন ও রাজনৈতিক লবিংয়ের জোরে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রক্রিয়া স্বাভাবিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)—যে পদগুলোর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা সরাসরি নিয়ন্ত্রিত হয়, সেখানে পুরনো সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসন এখন বাহিনীর ভেতরেই অসন্তোষের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৫ দিনে ২৫ কোটির বাণিজ্য ও কমান্ড ভেঙে পড়ার ঝুঁকি

প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী যেকোনো সংবেদনশীল বা দায়িত্বশীল পদে কর্মকর্তাদের বসানোর পূর্বে বিশেষ শাখার (এসবি) ক্লিয়ারেন্স ও গোপন প্রতিবেদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সততা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং পেশাগত ট্র্যাক রেকর্ড যাচাই করাই এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে এসব সংবেদনশীল গোয়েন্দা রিপোর্টকে কার্যত ধূলিসাৎ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বদলি বাণিজ্যকে ঘিরে। দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এক রেঞ্জ ডিআইজির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা যায়, মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে ওই কর্মকর্তা তিন শতাধিক উপপরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এবং কনস্টেবল পদমর্যাদার সদস্যকে গণহারে বদলি করেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে ব্যাপক রদবদলের নেপথ্যে প্রায় ২৫ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এই অস্বাভাবিক বদলি ও অর্থের প্রবাহ তদন্তের দাবি তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

“বিগত সরকারের শেষ সময়ে পুলিশ চরম ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের বিশ্বাস ফেরানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করতে থাকলে সেই চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।”

— নুরুল হুদা, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)

ওসির চেয়ার নিয়ে বিতর্ক ও তড়িঘড়ি প্রত্যাহারের খেলা

মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করে সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া এবং পরবর্তীতে জনরোষ বা সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্ত বদলানোর একাধিক দৃষ্টান্ত সম্প্রতি দেখা গেছে:

  • মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম: নেত্রকোনার পূর্বধলা থানায় দায়িত্ব পালনকালে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) স্পর্শকাতর খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন বাস্তবতায় নিয়ম অনুযায়ীই তিনি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
  • মো. মাহাবুব আলম: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার বর্তমান ওসির বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও গ্রেপ্তার বাণিজ্যের ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা থাকলেও অদৃশ্য কারণে তদন্ত থমকে রয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক।
  • আমির হোসেন সেরনিয়াবাত ও আব্দুল মজিদ: বিগত সরকারের পুরো মেয়াদ সুবিধাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমির হোসেনকে মাদারীপুরের শিবচরে পদায়ন করা হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়; ফলে মাত্র চার দিনের মাথায় তাঁকে প্রত্যাহার করা হয়। একইভাবে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানায় পদায়ন পাওয়া আব্দুল মজিদকে নিয়ে তীব্র বিতর্ক ওঠায় চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে জেলা পুলিশে সংযুক্ত করা হয়।

মামলার আসামিদের বিদেশগমন ও নিরাপদ আশ্রয়

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, অভ্যুত্থান চলাকালীন চরম দমনপীড়ন বা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাম আসা কর্মকর্তাদের অনেকেই জবাবদিহিতার বাইরে থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন কিংবা সুবিধাজনক সুবিধা ভোগ করছেন। তদন্তে পাওয়া এমন ৬ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

ইনভেস্টিগেটিভ ম্যাট্রিক্স: জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা ও আড়িপাতায় অভিযুক্ত ৬ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বর্তমান স্থিতি ও অবস্থান
কর্মকর্তা ও পদমর্যাদা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও অতীত ভূমিকা বর্তমান প্রশাসনিক স্থিতি
মোবাশশিরা হাবীব খান
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৩০তম বিসিএস)
আশুলিয়া থানা এলাকায় লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ইন্সপেক্টরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের রেকর্ড। সিআইডি হয়ে দ্রুত শিক্ষা ছুটি নিয়ে বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন।
শাহনেওয়াজ রাজু
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৩০তম বিসিএস)
নজরদারি সরঞ্জাম ও আড়িপাতার কাজে সংশ্লিষ্টতা এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এলআইসি শাখায় দীর্ঘকালীন প্রভাব। সিআইডির সাইবার অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল শাখায় বহাল; যুক্তরাজ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন।
মো. মনিরুজ্জামান ফকির
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৩০তম বিসিএস)
জুলাই আন্দোলনের সময় মাদারীপুরে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত। পিবিআই ঢাকা থেকে প্রেষণে চার বছরের বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থান করছেন।
মো. রফিকুল ইসলাম
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৩০তম বিসিএস)
তৎকালীন এডিসি (মতিঝিল) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনটি পৃথক হত্যা মামলার তদন্তাধীন এজাহারভুক্ত আসামি। আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার বদলে বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অপেক্ষমাণ তালিকায় আছেন।
নাদিয়া জুঁই
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৩০তম বিসিএস)
বিগত রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ এবং দলীয় বলয়ের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ১১ এপিবিএন উত্তরায় দায়িত্ব পালন করছেন এবং শান্তিরক্ষা মিশনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
মো. আশিক হাসান
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (৩৪তম বিসিএস)
ডিএমপির প্রভাবশালী ডিসি ও কমিশনারদের স্টাফ অফিসার ও এডিসি হিসেবে দীর্ঘকালীন দায়িত্ব পালন। পিবিআই সদর দপ্তর ঘুরে বর্তমানে শিক্ষা ছুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

ক্ষোভের বিস্ফোরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবিতব্য

বছরের পর বছর রাজনৈতিক কারণে বঞ্চিত হওয়া কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশ এখন চরম হতাশায় নিমজ্জিত। তাঁদের বক্তব্য, অতীত সরকারের সময় কালো তালিকাভুক্ত হয়ে পদোন্নতি ও স্বাভাবিক পোস্টিং থেকে দূরে থাকা পেশাদারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল। অথচ মাঠপর্যায়ে পুনর্বাসিত হচ্ছে তারাই, যারা কোটি টাকার বদলি বাণিজ্য অথবা অদৃশ্য খুঁটির জোরে সব পক্ষকে ম্যানেজ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কখনোই কোনো দল বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত লাঠিয়াল হতে পারে না। অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে পোস্টিং বিক্রি এবং গোয়েন্দা রিপোর্টকে পাশ কাটিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসন বন্ধ না হলে পুলিশের চেইন-অব-কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বদলি বাণিজ্যের স্বচ্ছ অডিট, অভিযুক্তদের বিচার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার কোনো বিকল্প নেই।

⚖️ পেশাদার সম্পাদকীয় অঙ্গীকার ও বক্তব্য যাচাই নীতি (Right of Reply)

ব্ল্যাক লেন্স সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক কর্মকর্তার ক্ষেত্রে উত্থাপিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক স্থিতির তথ্য যথাযথ দাপ্তরিক রেকর্ড অনুযায়ী যাচাই করা হয়েছে। খিলগাঁও থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, তৎকালীন বাস্তবতায় তিনি আইন অনুযায়ী কাজ করেছিলেন। ফতুল্লা থানার ওসি মো. মাহাবুব আলম তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়েছেন।

প্রতিবেদনে উল্লিখিত অপর কর্মকর্তাদের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর, সিআইডি, পিবিআই বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা কিংবা অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্ব সহকারে এই ডসিয়ারে সংযোজন করা হবে।


English Abstract: The 25-Crore Transfer Racket & Evading Accountability

Institutional Accountability Audit: In the wake of Bangladesh’s historic student-people uprising, public expectations called for immediate institutional reform and merit-based restructuring of law enforcement. However, this investigative report by Black Lens 2.0 uncovers alarming allegations of a commercialized transfer trade where sensitive field positions—including Officers-in-Charge (OC) and Superintendents of Police (SP)—continue to be allocated despite adverse Special Branch (SB) intelligence records. Notably, an outgoing Range DIG reportedly oversaw the bulk transfer of more than 300 police personnel (SIs, ASIs, and constables) within merely 15 days, allegedly involving financial transactions exceeding BDT 250 million (25 Crore). Concurrently, at least six senior Additional Superintendents of Police implicated in July uprising violence, cyber surveillance, and homicide investigations have managed to depart abroad on study leaves or secure positions on UN peacekeeping candidate rosters, avoiding judicial accountability.

Mohammad Mehedi Hasan

Recent Posts

কসবায় ৫ম শ্রেণির শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ: ফার্নিচার দোকানির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ৫ম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় ফার্নিচার দোকান মালিক ইয়াসিন মিয়ার বিরুদ্ধে…

3 days ago

This website uses cookies.