কসবা পৌর এলাকার কদমতলী মোড়ে তখন সকালের চিরচেনা কর্মব্যস্ততা; যানবাহনের আওয়াজ আর বাজারের ভিড় ঠেলে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সামনে জড়ো হয়েছিলেন বেশ কিছু মানুষ। ভবনের প্রবেশমুখে নতুন টানানো সাইনবোর্ড—’কসবা মডেল হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। কোনো আড়ম্বরপূর্ণ ফিতা কাটার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বৃহস্পতিবার সকালে আয়োজন করা হয়েছিল একটি মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের। কসবা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি […]
কসবা পৌর এলাকার কদমতলী মোড়ে তখন সকালের চিরচেনা কর্মব্যস্ততা; যানবাহনের আওয়াজ আর বাজারের ভিড় ঠেলে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনের সামনে জড়ো হয়েছিলেন বেশ কিছু মানুষ। ভবনের প্রবেশমুখে নতুন টানানো সাইনবোর্ড—’কসবা মডেল হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। কোনো আড়ম্বরপূর্ণ ফিতা কাটার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বৃহস্পতিবার সকালে আয়োজন করা হয়েছিল একটি মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের। কসবা উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম পরিচালক ইকলিল আজম স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে হাত তুলেছিলেন মোনাজাতে। বাইরে থেকে দেখলে এটি আর দশটি সাধারণ ব্যবসা শুরুর দৃশ্য মনে হলেও, এই দোয়ার আবহের আড়ালেই দানা বাঁধছিল এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্ন।
কদমতলী মোড়ের এই ভবনটির সামনে দাঁড়ালে সহজেই চোখে পড়ে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানা। দূরত্ব বড়জোর এক-দেড়শ মিটার। অথচ ঠিক দুদিন আগে, ২২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি কড়া পরিপত্র জারি হয়েছিল—প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া যাবে না। এমনকি সেই সীমানার ভেতরের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্র্যাকটিস করার ওপরও জারি করা হয়েছে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা। রাজধানীর স্বাস্থ্য ভবনের সেই নির্দেশনা যখন জেলা ও উপজেলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই সরকারি হাসপাতালের সীমানার একেবারে নাকের ডগায় শুরু হলো নতুন এই বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রাথমিক যাত্রা।
আইনি অনুমোদন ও দূরত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক ইকলিল আজমের কণ্ঠে ছিল আত্মপক্ষ সমর্থনের সুর। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের জায়গাটি নিয়ম মেনে লিজ নেওয়ার দাবি করে তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চূড়ান্ত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে প্রায় এক মাস আগে। পৌরসভার প্রাথমিক ট্রেড লাইসেন্স হাতে থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চূড়ান্ত লাইসেন্স যে এখনো মেলেনি, তা স্বীকার করে তিনি বলেন, “এখনো কোনো চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি, চিকিৎসাসেবার কাজও শুরু করিনি। শুধু প্রাথমিক কার্যক্রম হিসেবে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।” তবে সরকারের এক কিলোমিটারের নিষেধাজ্ঞার কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি কিছুটা সুর নরম করে যোগ করেন, “যদি আমাদের এই উদ্যোগ সরকারের সাম্প্রতিক নীতিমালার সঙ্গে কোনোভাবে সাংঘর্ষিক হয়, তবে প্রয়োজনে হাসপাতালটি এখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে।”
মুদ্রার ওপিঠটি অবশ্য স্পষ্ট করেছে স্বাস্থ্য প্রশাসন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা. মো. মিজানুর রহমানের কাছে বিষয়টি পৌঁছালে তিনি জানান, স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে চূড়ান্ত লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম শুরুর কোনো সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠানটির কাগজপত্র খতিয়ে দেখার পাশাপাশি এটি সরকারি হাসপাতালের নিষিদ্ধ এক কিলোমিটার সীমানার মধ্যে পড়েছে কি না, তা সরেজমিনে তদন্ত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, সরকারি নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সব মিলিয়ে কদমতলী মোড়ের মুক্তিযোদ্ধা ভবনে ঝুলতে থাকা সাইনবোর্ডটি এখন কেবল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, বরং তা প্রান্তিক জনপদে স্বাস্থ্যসেবার মানদণ্ড, প্রশাসনিক সদিচ্ছা এবং আইনের শাসনের এক বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সরকারি আদেশ মেনে এক কিলোমিটারের বাফার জোন সুরক্ষিত থাকবে, নাকি নিয়মের ফাঁক গলে আরেকটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের স্থায়ী ঠিকানা তৈরি হবে—সেই উত্তরের দিকেই এখন তাকিয়ে কসবাবাসী।
