
মোহাম্মদ মেহেদী হাসান, সম্পাদক ও সিইও, ব্ল্যাক লেন্স ২.০কসবা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তখন তা কেবল ব্যক্তির নয়, বরং পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ মনির আহমেদের বিরুদ্ধে মাকছুদা আক্তার নামের এক নারীর তোলা ঘুষ ও হয়রানির অভিযোগটি সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে ‘ব্ল্যাক লেন্স ২.০’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে এবং প্রশাসনিক তদন্তের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই অভিযোগের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক সত্য।
ঘটনার সূত্রপাত ও পারিবারিক বিরোধতদন্তে দেখা যায়, মাকছুদা আক্তার এবং তার জা আকলিমা আক্তারের মধ্যে জমি-জমা ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ ছিল। গত ১৫/১০/২০২৫ তারিখে আকলিমা আক্তার আদালতে একটি নালিশি মামলা (সিআর মামলা নং-৮৩৬/২০২৫) দায়ের করেন। বিজ্ঞ আদালত মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেন এসআই মনির আহমেদকে।
তদন্ত চলাকালে মাকছুদা আক্তার অভিযোগ তোলেন যে, তদন্ত প্রতিবেদন তার পক্ষে দেওয়ার জন্য এসআই মনির ২ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেছেন। অথচ তিনি এই মর্মে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেন গত এক সপ্তাহ আগে।মুখোমুখি অনুসন্ধানে মাকছুদা আক্তারের স্ববিরোধী বক্তব্যঅনুসন্ধানকালে মাকছুদা আক্তারের সাথে কথা বলেন প্রতিবেদক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান।
মাকছুদা আক্তার দাবি করেন যে, এসআই মনির তার বিরুদ্ধে একটি “চাঁদাবাজির মামলা” দিয়েছেন এবং তিনি সেই বিষয়ে আতঙ্কে আছেন।
* প্রতিবেদকের প্রশ্ন: “যদি আপনার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই মামলার বর্তমান অবস্থা কী? আপনি কি জামিনে আছেন নাকি পলাতক?” * মাকছুদা আক্তারের প্রতিক্রিয়া: এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। তার বক্তব্যে ব্যাপক অসংলগ্নতা এবং স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা গেছে।বাস্তবতা হলো, এসআই মনির কোনো নতুন মামলা দেননি; তিনি কেবল আদালতের নির্দেশে আকলিমার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন, যেখানে প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে চাঁদাবাজির ধারা (৩৮৫/৩৮৬) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রশাসনিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য: অভিযোগ যখন ভিত্তিহীন
১. ওসি (তদন্ত) রিপন দাসের বক্তব্য: মাকছুদার করা অভিযোগের বিষয়ে কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) রিপন দাসের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি স্পষ্টভাবে জানান, “মহিলার এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পুলিশ বাদী হয়ে উক্ত মহিলার বিরুদ্ধে এমন কোনো চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেনি।”
২. আকলিমা আক্তারের বক্তব্য:মাকছুদা আক্তার বারবার দাবি করেছিলেন যে, বাদী আকলিমা আক্তার এসআই মনিরের “ভাগনী” বা আত্মীয়। এ বিষয়ে আকলিমা আক্তার বলেন, “এসআই মনিরের সাথে আমার কক্ষনো কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না এবং নেই। মাকছুদা কেবল তদন্তকে প্রভাবিত করতে এই মিথ্যাচার করেছেন। এই মহিলা যে এতটা নিচে নামতে পারবেন সেইটা আমি কল্পনাও করি নাই। এসআই মনির কেবল তার সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন।”
৩. অভিযুক্ত এসআই মনিরের বক্তব্য:নিজের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসঙ্গে এসআই মনির আহমেদ বলেন, “উক্ত মহিলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এই অভিযোগ করেছেন। আমি কেবল আদালতের নির্দেশে নিরপেক্ষ তদন্ত করেছি। এমনকি উনার দায়ের করা দুটি মামলাও মহামান্য আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। আমি এখানে মামলা দেওয়া বা নেওয়ার কেউ নই, কেবল সত্য উদঘাটন করাই ছিল আমার কাজ।”
ডিজিটাল এভিডেন্স ও প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী পুলিশ সুপার (কসবা সার্কেল) মোঃ নাজমুস সাকিব এই অভিযোগের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত পরিচালনা করেন। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য:
* ভয়েস রেকর্ড ও সিসিটিভি: তদন্তে পাওয়া ভয়েস রেকর্ডে মাকছুদার স্বামী জুয়েল মিয়া স্বীকার করেছেন যে বিতর্কিত স্ট্যাম্পগুলো তাদের কাছেই রয়েছে। এছাড়াও সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।
* সাক্ষীদের জবানবন্দি: মোট ১০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৮ জনই এসআই মনিরের নিরপেক্ষতার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন। কেবল মাকছুদা ও তার নাবালক পুত্র ছাড়া আর কেউ টাকা দাবির বিষয়টি সমর্থন করেনি।
* পেশাগত রেকর্ড: এসআই মনিরের ক্যারিয়ার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তিনি এ পর্যন্ত ২০২টি পুরস্কার পেয়েছেন এবং তার চাকরির রেকর্ড সন্তোষজনক।
চূড়ান্ত বিশ্লেষণ: সত্যের আড়ালে কৌশলঅনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মানদণ্ডে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মাকছুদা আক্তার মূলত একটি “প্রতিরক্ষামূলক কৌশল” হিসেবে এই সংবাদ সম্মেলন ও অভিযোগগুলো করেছিলেন। যখন কেউ বুঝতে পারেন যে আইনি তদন্ত তার বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তখন তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এটি একটি পরিচিত প্রবণতা।প্রশাসনিক তদন্তে এসআই মনিরকে ইতিমধ্যে নির্দোষ হিসেবে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ প্রমাণ ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা কেবল পেশাদারিত্বকেই ব্যাহত করে না, বরং বিচার প্রক্রিয়াকেও দীর্ঘায়িত করে।
ব্ল্যাক লেন্স ২.০ সত্যের সন্ধানে অবিচল থাকবে এবং প্রতিটি নিউজের নেপথ্যের কাহিনী তুলে ধরবে।

