ছায়া-অর্থনীতির অভয়ারণ্য: কসবার অন্ধকারে যখন বিলাসবহুল ‘সি-এইচআর’ বহর
একটি বিশেষ ইনভেস্টিগেটিভ স্টোরি
মাননীয় জেলা পুলিশ সুপার, কসবার ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এবং চাঞ্চল্যকর চোরাচালান অত্যন্ত সুকৌশলে ও ফিল্মি কায়দায় সম্পন্ন হওয়ার পর, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আপনাকে কোন পদকে ভূষিত করা উচিত—তা নিয়ে হয়তো নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দেশের মূল অর্থনীতি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ যখন গ্রে মার্কেটে (Black Market) প্রবেশ করে, তখন তার প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভার কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়; এটি একটি সুপরিকল্পিত ছায়া-অর্থনীতির গল্প, যা ব্ল্যাক লেন্স ২.০-এর অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে। দেশের অর্থনীতিকে এই ভয়াবহ আঘাত থেকে রক্ষা করতে কসবার সচেতন নাগরিকদের সামনে এই রোমহর্ষক রাতের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হলো।
দ্য স্মোকস্ক্রিন: মানুষের দৃষ্টি যখন অন্যদিকে
গত কয়েকদিন ধরে কসবা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষের দৃষ্টি দুটি সুনির্দিষ্ট দিকে নিবদ্ধ ছিল। একদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশের রদবদল নিয়ে চলছিল তুমুল তর্ক-বিতর্ক। অন্যদিকে, কথিত এনসিপি, ছাত্রলীগ বা তাকবীর নেতা শাহিন ওরফে ‘গ্যাস শাহিন’-এর মাদক আটকের এক নাটকীয় আখ্যান মানুষের মুখে মুখে ঘুরছিল। অভিযোগ উঠেছিল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য তাকে ধরার বদলে উল্টো সহযোগিতা করেছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন এই সাজানো ‘ম্যাজিক শো’ দেখতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে চলছিল আসল খেলা। টায়ার-টু (Tier-2) গডফাদারদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ মানুষের এই মনোযোগ বিচ্যুতির সুযোগ নিয়ে কসবার ইতিহাসে স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ ভারতীয় অবৈধ মাদক ও চোরাই পণ্যের চালান নির্বিঘ্নে সীমান্ত পার করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অপারেশন ‘সি-এইচআর’: রাতের আঁধারে শাফলিং মেথড
দিনটি ছিল গত ২ জুন। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১১টা পেরিয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ।
কসবার কদমতলী থেকে শুরু করে নয়নপুর হয়ে কুমিল্লার দিকের রাস্তায় হঠাৎ করেই বিলাসবহুল গাড়ির আনাগোনা বেড়ে যায়। ব্ল্যাক লেন্স-এর অনুসন্ধানী টিমের চোখে ধরা পড়ে ৫টি অত্যাধুনিক ‘Toyota C-HR’ মডেলের প্রাইভেটকার। গাড়িগুলো কোনো সাধারণ কনভয় বা বহর হিসেবে যাচ্ছিল না; তারা অত্যন্ত পেশাদারদের মতো ‘শাফলিং মেথড’ (Shuffling Method) ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
রাতের অন্ধকারে চলতে থাকা এই বিলাসবহুল বহরের মধ্যে একটি কালো এবং একটি ম্যাজেন্টা রঙের C-HR গাড়িও ছিল। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়টি উন্মোচিত হয় গাড়ির নম্বর প্লেট পর্যবেক্ষণের পর। টিমের সদস্যরা স্বচক্ষে তিনটি গাড়ির নম্বর প্লেট শনাক্ত করতে সক্ষম হন। বিস্ময়করভাবে, তিনটি গাড়িতেই হুবহু একই নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছিল—‘ঢাকা মেট্রো * ১৯১৯০১’। বিআরটিএ (BRTA) কর্তৃক ইস্যুকৃত কোনো বৈধ নথিতে একই নম্বরের তিনটি গাড়ির অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব। এটি ছিল নিখুঁত জালিয়াতি।
সকাল ৭টার রহস্য এবং একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন
রাতের আঁধার কেটে যখন সকালের আলো ফুটতে শুরু করে, তখন ঘটনা আরও রহস্যময় মোড় নেয়।
আমাদের টিমের উপস্থিতি সম্ভবত চোরাকারবারিদের রাডারে ধরা পড়েছিল। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গাড়িগুলো তখন অন্য কোনো সংকেত বা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল। ঠিক এমন একটি সন্দেহজনক মুহূর্তে, সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন কসবা উপজেলা ছাত্রদলের এক নেতা, সাদ্দাম খন্দকার।
সকাল ৭টায় সেই নির্দিষ্ট স্থানে তিনি ঠিক কীসের তদন্ত করতে বা কাকে খুঁজতে গিয়েছিলেন—তা এখন একটি বিরাট ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ইন্ধন রয়েছে কি না, তা নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
যাদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রয়েছে, তারা কদমতলী থেকে শুরু করে মাননীয় সংসদ সদস্য হাজী জসীম সাহেবের এলাকা হরিমঙ্গল বা শশীদল পর্যন্ত হাইওয়ের পাশের সিসিটিভি ফুটেজগুলো তলব করে বিশ্লেষণ করলেই এই ফিল্মি চোরাচালানের চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে যাবেন। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার যে ব্যর্থ প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তা অন্তত ‘The Black Lens 2.0’-এর ডেটা-নির্ভর সাংবাদিকতার কাছে ধোপে টিকবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আগামীর শঙ্কা
এই বৃহৎ চোরাচালান কি কেবলই গুটিকয়েক অপরাধীর কাজ? মোটেও না।
এখানে প্রশ্ন ওঠে কথিত মাদক-চোরাকারবারির অন্যতম সন্দেহভাজন গডফাদার এবং অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা এসআই শামীম ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়ে। ওই নির্দিষ্ট সময়ে তার ডিউটি টাইমলাইন এবং গতিবিধি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে ফরেনসিক অডিটের আওতায় আনা উচিত।
পাশাপাশি, শাহিন ওরফে ‘গ্যাস শাহিন’-এর ঘটনাটি কি কেবলই একটি ‘তুরুপের তাস’ বা ডিকয় (Decoy) ছিল? গত পরশুর সর্ববৃহৎ চোরাচালান নির্বিঘ্নে পার করার জন্যই কি তার এই নাটকীয় আটকের গল্প সাজানো হয়েছিল? কসবা তারাপুরের গ্যাস সুকৌশলে ভারতে উত্তোলনে কে বা কারা সহযোগিতা করেছিল, সেই ‘সোশ্যাল মিডিয়া হিরো’দের মুখোশও সময়ের সাথে সাথে উন্মোচিত হবে।
পরবর্তী অধ্যায়ের অপেক্ষায়:
খুব শিগগিরই কাভার্ড ভ্যান এবং ওষুধের ফার্মেসির ভ্যান ব্যবহার করে কীভাবে চোরাচালানের নেটওয়ার্ক চালানো হচ্ছে, তার সবিস্তার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
ব্ল্যাক লেন্স বা ব্ল্যাক লেন্স ২.০ কোনো স্টোরি পিচ বা ইনভেস্টিগেটিভ লিড কোনো প্রমিনেন্ট মিডিয়া আউটলেটের কাছে বিক্রি করে না। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার তাগিদে আমাদের সংগৃহীত প্রতিটি তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।